নারায়ণগঞ্জকে পাশ কাটিয়েই ঢাকার মেট্রো নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ | ভবিষ্যৎ লাইন-২ নিয়েও অনিশ্চয়তা...

দুই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে আরও দুই মেট্রোরেল প্রকল্প, একটিতেও নেই না.গঞ্জ শহর

68

রফিকুল ইসলাম জীবন :

ঢাকার যানজট কমাতে মেট্রোরেল নির্মাণে আরও ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তুতি চলছে। রাজধানীর দুই গুরুত্বপূর্ণ করিডোরে মেট্রোরেল নির্মাণ ও সম্প্রসারণে এই বিপুল অর্থ ব্যয় হবে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই বিশাল বিনিয়োগের মানচিত্রে নারায়ণগঞ্জ শহর কোথায়?

উত্তরটি নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য হতাশাজনক—প্রস্তাবিত দুটি প্রকল্পের কোনোটিই সরাসরি নারায়ণগঞ্জ শহরকে যুক্ত করছে না।

একদিকে কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর এবং নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল পর্যন্ত এমআরটি লাইন-১, অন্যদিকে সাভারের হেমায়েতপুর থেকে গাবতলী, মিরপুর, বনানী, গুলশান ও নতুনবাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। দুই প্রকল্পেই ব্যয় বাড়ছে দ্বিগুণের বেশি। সংশোধিত প্রস্তাবে লাইন-১-এর ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা এবং লাইন-৫-এর ব্যয় প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা।

অর্থাৎ দুই প্রকল্পেই ব্যয় হবে ২ লাখ কোটি টাকার বেশি। অথচ ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ শহর এই দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের সরাসরি সুবিধা পাচ্ছে না।

এটি কি কেবল পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা, নাকি দীর্ঘদিনের পরিবহন পরিকল্পনায় নারায়ণগঞ্জকে অগ্রাধিকার না দেওয়ারই আরেকটি উদাহরণ—এখন সেই প্রশ্নই সামনে এসেছে।

নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা যাতায়াতে প্রতিদিন লাখো মানুষের চাপ থাকলেও রাজধানীর সঙ্গে দ্রুত, নির্ভরযোগ্য ও আধুনিক গণপরিবহনের স্থায়ী সংযোগ এখনো গড়ে ওঠেনি। সড়কপথে যানজট, গণপরিবহনের সংকট এবং দীর্ঘ যাতায়াতের কারণে কর্মজীবী মানুষ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা নিয়মিত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন।

অথচ ঢাকার উত্তর ও উত্তর-পূর্ব অংশে মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে একের পর এক হাজার কোটি টাকার প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে।

প্রশ্ন উঠছে, ঢাকার জনসংখ্যা ও যানজটের চাপ বিবেচনায় মেট্রোরেল প্রয়োজন হলে নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতা কি পরিকল্পনাকারীদের অজানা?

নারায়ণগঞ্জ শুধু ঢাকার পাশের একটি জেলা নয়। এটি দেশের অন্যতম প্রধান শিল্প ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। পোশাকশিল্প, নিটওয়্যার, রপ্তানি, নদীবন্দর, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিপুল কর্মসংস্থানের কারণে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার মধ্যে চলাচল করেন। এই বিপুল যাতায়াতের বড় অংশ সড়কনির্ভর।

ফলে নারায়ণগঞ্জকে বাদ রেখে ঢাকার গণপরিবহন অবকাঠামোর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান কতটা কার্যকর হবে—সেটিও এখন প্রশ্নের মুখে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় অবশ্য নারায়ণগঞ্জের জন্য আশার একটি জায়গা রয়েছে। এমআরটি লাইন-২-এর সম্ভাব্য রুটে ঢাকার গাবতলী থেকে বিভিন্ন এলাকা হয়ে মতিঝিল, কামালাপুর, সাইনবোর্ড, ভুইগড়, জালকুড়ি হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে মেট্রোরেল সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা রয়েছে। কিন্তু সেটি এখনো বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প নয়। কবে এর কাজ শুরু হবে, অর্থায়ন কীভাবে হবে, নারায়ণগঞ্জ শহরের কোথায় স্টেশন হবে কিংবা আদৌ নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি বাস্তবায়িত হবে কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।

এখানেই তৈরি হয়েছে নারায়ণগঞ্জবাসীর উদ্বেগ।

কারণ মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় যত বাড়ছে, নতুন প্রকল্প গ্রহণের সুযোগ ও অগ্রাধিকারের প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে যে দুটি প্রকল্পের ব্যয় প্রস্তাব ২ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছেছে, সেখানে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। লাইন-১-এর ক্ষেত্রে সংশোধিত ব্যয় অনুযায়ী প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় প্রায় ৩ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা এবং লাইন-৫-এ প্রায় ৪ হাজার ৬৬০ কোটি টাকা।

এমন ব্যয়বহুল অবকাঠামো নির্মাণের সময় একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই—দেশের সবচেয়ে ব্যস্ত শিল্পাঞ্চলগুলোর একটি নারায়ণগঞ্জকে দ্রুত গণপরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করতে কেন একই মাত্রার অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না?

বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, শুধু রাজধানীর ভেতরে মেট্রোরেল নির্মাণ করলেই ঢাকার যানজটের স্থায়ী সমাধান হবে না। বৃহত্তর ঢাকা অঞ্চলের সঙ্গে শিল্প ও আবাসিক এলাকাগুলোর দ্রুত যোগাযোগ নিশ্চিত করতে সমন্বিত গণপরিবহন নেটওয়ার্ক প্রয়োজন।

সেই বিবেচনায় নারায়ণগঞ্জকে বাদ দিয়ে ঢাকার মেট্রোরেল পরিকল্পনা কতটা পূর্ণাঙ্গ—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।

নারায়ণগঞ্জবাসীর অভিযোগ, রাজধানীর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগ থাকা সত্ত্বেও তাদের গণপরিবহন পরিকল্পনায় বারবার পিছিয়ে রাখা হচ্ছে। বহু বছর ধরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেল, সড়ক ও গণপরিবহন নিয়ে নানা পরিকল্পনা হলেও আধুনিক দ্রুতগতির গণপরিবহন ব্যবস্থার বাস্তব সুফল এখনো অধরা।

দুই লাখ কোটি টাকারও বেশি ব্যয়ে ঢাকায় যখন আরও দুই মেট্রোরেল প্রকল্প এগিয়ে যাচ্ছে, তখন নারায়ণগঞ্জবাসীর সরাসরি প্রশ্ন—

এত বিপুল অর্থের মেট্রোরেল যদি ঢাকার যানজট কমানোর জন্য হয়, তবে ঢাকার সবচেয়ে কাছের শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ শহর সেই নেটওয়ার্কের বাইরে থাকবে কেন?

আর যদি ভবিষ্যতের এমআরটি লাইন-২-ই নারায়ণগঞ্জের সমাধান হয়, তাহলে সেই প্রকল্পের বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা কোথায়?

নারায়ণগঞ্জবাসী এখন প্রতিশ্রুতি নয়, জানতে চায়—মেট্রোরেলের মানচিত্রে তাদের শহরের অবস্থান আসলে কোথায়?