নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে জাকির খান ও আজমেরী ওসমান—দুটি বহুল আলোচিত নাম। বছরের পর বছর ধরে নানা অভিযোগ, মামলা, বিতর্ক ও গণমাধ্যমের নেতিবাচক প্রতিবেদনের কেন্দ্রে থেকেও দুজনকে ঘিরে রয়েছে শক্তিশালী অনুসারী বলয়। বিভিন্ন সময়ে তাঁদের সমর্থনে মিছিল, শোডাউন ও প্রকাশ্য রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, এত অভিযোগ ও বিতর্কের পরও তাঁদের ঘিরে এই জনপ্রিয়তা কিংবা প্রভাবের উৎস কোথায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতির ক্ষমতার কাঠামো, দলীয় আনুগত্য, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি এবং দীর্ঘদিনের সামাজিক-রাজনৈতিক নেটওয়ার্ককে বিবেচনায় নিতে হয়। কারণ রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা সবসময় গ্রহণযোগ্যতার সমার্থক নয়। অনেক সময় রাজনৈতিক আনুগত্য, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ক্ষমতার প্রভাব, পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানও কোনো ব্যক্তিকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে পারে।
জাকির খানের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ছাত্রদলের রাজনীতি, মামলা এবং পলাতক জীবনের ইতিহাস জড়িয়ে আছে। ২০০৩ সালে ব্যবসায়ী নেতা ও বিকেএমইএর সাবেক সহসভাপতি সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় তাঁকে প্রধান আসামি করা হয়েছিল। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর ২০২২ সালে বিদেশি অস্ত্রসহ তাঁকে গ্রেপ্তারের খবর জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়। গ্রেপ্তারের সময় বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁকে ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছিল।
তবে এই গল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। ২০২৫ সালের ৭ জানুয়ারি সাব্বির আলম খন্দকার হত্যা মামলায় জাকির খানসহ সব আসামিকে খালাস দেন আদালত। আদালতের এই রায়ের অর্থ হলো, ওই মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে পারেনি। ফলে তাঁকে নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অভিযোগ, মামলা ও আদালতের চূড়ান্ত রায়ের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
কারামুক্তির পর জাকির খানকে ঘিরে আবারও প্রকাশ্যে আসে ব্যাপক সমর্থনের চিত্র। তাঁর অনুসারীদের মোটরসাইকেল শোডাউন ও রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। একই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন করে আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা ও বাহিনী গড়ে তোলার অভিযোগও ওঠে। অর্থাৎ দীর্ঘদিনের মামলা ও বিতর্ক তাঁর রাজনৈতিক পরিচিতি কমিয়ে দেওয়ার বদলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাঁকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।
আজমেরী ওসমানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি বৈপরীত্য দেখা যায়। তাঁকে নিয়ে ২০১৪ সালে প্রথম আলো প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের বরাত দিয়ে ১৮ বছরে ১২টি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগের কথা বলা হয়েছিল। তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত ও অভিযোগ নিয়েও তাঁর নাম বহুবার জাতীয় গণমাধ্যমে এসেছে। র্যাব একসময় তাঁকে ত্বকী হত্যার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি দলের নেতৃত্বে থাকার অভিযোগ করেছিল। পরবর্তী সময়ে ১৬৪ ধারায় দেওয়া এক জবানবন্দিতেও তাঁর নাম উঠে আসে বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনোটি আদালতের চূড়ান্ত রায়ে তাঁর বিরুদ্ধে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না।
তারপরও আজমেরী ওসমান নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি অত্যন্ত পরিচিত ও প্রভাবশালী নাম হয়ে আছেন। এর পেছনে তাঁর পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয় যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হওয়া ব্যক্তিগত অনুসারী ও রাজনৈতিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ক।
এখানেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির একটি কঠিন বাস্তবতা সামনে আসে। কোনো নেতার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলেই তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব শেষ হয়ে যায় না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযোগ ও বিতর্ক তাঁকে আরও পরিচিত করে তোলে। জাতীয় গণমাধ্যমে বারবার কোনো ব্যক্তির নাম প্রকাশিত হলে তিনি একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিসরের বাইরেও পরিচিত মুখে পরিণত হন। তাঁর সমর্থকেরা তখন অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বা প্রতিপক্ষের প্রচারণা হিসেবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পান।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কোনো নেতার শোডাউন, কর্মী-সমর্থকদের ভিড়, মোটরসাইকেল বহর কিংবা আবেগঘন বক্তব্য মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এতে একটি শক্তিশালী জনসমর্থনের চিত্র তৈরি হয়। কিন্তু দৃশ্যমান ভিড় বা শোডাউনকে সরাসরি গণভিত্তিক জনপ্রিয়তার প্রমাণ হিসেবে দেখা যায় না। প্রকৃত জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের সবচেয়ে বড় মাপকাঠি হলো অবাধ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে জনগণের রায়।
রাজনীতিতে ‘আমাদের লোক’ মানসিকতাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, তাঁর সমর্থকদের একটি অংশ যদি মনে করেন তিনি তাঁদের রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাহলে তাঁরা অভিযোগের চেয়ে আনুগত্যকেই বেশি গুরুত্ব দিতে পারেন। বিশেষ করে স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, সামাজিক যোগাযোগ, দলীয় পরিচয় এবং বিপদের সময় পাশে থাকার স্মৃতি অনেক সময় একজন নেতার প্রতি দীর্ঘস্থায়ী আনুগত্য তৈরি করে।
আরেকটি বিষয় হলো ভয় ও ক্ষমতার মনস্তত্ত্ব। কোনো ব্যক্তিকে যদি একটি এলাকায় অত্যন্ত প্রভাবশালী বা শক্তিশালী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তাঁর সঙ্গে থাকার মধ্যে কেউ কেউ নিরাপত্তা, রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা সামাজিক মর্যাদার সম্ভাবনা দেখতে পারেন। অন্যদিকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া নেতাও তাঁর অনুসারীদের কাছে ‘দাপুটে’ বা ‘সাহসী’ হিসেবে পরিচিত হতে পারেন। ফলে বাইরে থেকে যে ইমেজকে নেতিবাচক মনে হয়, অনুসারীদের একটি অংশ সেটিকেই শক্তির প্রতীক হিসেবে দেখতে পারে।
তবে জাকির খান ও আজমেরী ওসমানের ক্ষেত্রে ‘জনপ্রিয়তা’ শব্দটি ব্যবহার করার আগে আরও একটি প্রশ্ন জরুরি—এই জনপ্রিয়তা কতটা প্রকৃত জনসমর্থন আর কতটা ব্যক্তিগত আনুগত্য, রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক, ক্ষমতার প্রভাব কিংবা দীর্ঘদিনের পরিচিতির ফল?
সম্ভবত এর উত্তর একক কোনো ব্যাখ্যায় পাওয়া যাবে না। তাঁরা একই সঙ্গে বিতর্কিত এবং একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে জনপ্রিয় হতে পারেন। কারণ জনপ্রিয়তা সবসময় নৈতিকতার পুরস্কার নয়; কখনো তা তৈরি হয় পরিচয়, আনুগত্য, ক্ষমতা, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, রাজনৈতিক প্রত্যাশা এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমীকরণে।
জাকির খান ও আজমেরী ওসমানকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের বাস্তবতা তাই শুধু দুই ব্যক্তির রাজনৈতিক উত্থান-পতনের গল্প নয়। এটি স্থানীয় রাজনীতিতে ব্যক্তি বনাম প্রতিষ্ঠান, আনুগত্য বনাম নীতি এবং অভিযোগ বনাম আইনি প্রমাণের দীর্ঘ দ্বন্দ্বেরও প্রতিচ্ছবি।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকেই যায়—অভিযোগে বারবার আলোচিত কোনো ব্যক্তি কীভাবে একটি শক্তিশালী অনুসারী বলয় ধরে রাখেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে শুধু ওই ব্যক্তির দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে সেই সমাজ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামোর দিকেও, যে কাঠামো কোনো কোনো বিতর্কিত ব্যক্তিকেও দীর্ঘদিন প্রভাবশালী থাকার সুযোগ করে দেয়।




