নারায়ণগঞ্জে ফের গ্রেফতার আতঙ্ক, ‘নিরীহ কর্মীরাই বেশি হয়রানির শিকার’...

হাসিনা-শামীমের ফেরার ঘোষণায় চাপে তৃণমূল আওয়ামী লীগ

17

আমজাদ হোসেন :

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের মাঠপর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে গ্রেফতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান জোরদার হয়েছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানা গেছে।

তৃণমূল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশের অভিযোগ, বড় ধরনের কোনো অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেকেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে যারা আর্থিকভাবে অসচ্ছল এবং বিদেশে গিয়ে আত্মগোপনে থাকার মতো সামর্থ্য রাখেন না, তাদের মধ্যেই আতঙ্ক সবচেয়ে বেশি।

সম্প্রতি বক্তাবলী ইউনিয়নের রাসেল মেম্বারের গ্রেফতারকে ঘিরে এ বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাসেল মেম্বার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এর আগেও তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। বেশ কিছুদিন কারাভোগের পর তিনি জামিনে মুক্তি পান। এবার শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমানের দেশে ফেরার ঘোষণার পর আবারও তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাসেল মেম্বারের গ্রেফতারের ঘটনায় বক্তাবলী এলাকায় নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম, চাঁদাবাজি কিংবা বড় ধরনের কোনো অপরাধের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তাদের জানা নেই। ফলে তাকে কেন বারবার মামলায় জড়ানো হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

তবে রাসেল মেম্বারের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ রয়েছে এবং কোন মামলায় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্য ও আদালতের নথিই চূড়ান্ত বিবেচ্য। বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগে তাকে নির্দোষ বা অপরাধী—কোনোটিই চূড়ান্তভাবে বলা যায় না।

এদিকে ইসদাইর এলাকার আউয়াল মেম্বারকেও নতুন করে গ্রেফতার আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এর আগেও তিনি কারাভোগ করেছেন। বর্তমানে আবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের আশঙ্কায় তিনি উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে এখন একই ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অনেকে প্রকাশ্যে চলাফেরা কমিয়ে দিয়েছেন। কেউ কেউ আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও জানা গেছে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে রাজনৈতিক কর্মসূচি বা দলের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও মাঠপর্যায়ের সাধারণ নেতাকর্মীরাই এখন গ্রেফতার ও মামলার মুখোমুখি হচ্ছেন।

তাদের ভাষ্য, যারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেছেন, তাদের সবাই অপরাধী নন। কেউ দলীয় পদে ছিলেন, কেউ নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি ছিলেন, আবার কেউ শুধুমাত্র স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে কেউ যদি নির্দিষ্ট কোনো অপরাধে জড়িত থাকেন, তাহলে তদন্ত করে আইন অনুযায়ী বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে কাউকে হয়রানি করা হলে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থানও ভিন্ন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের সহিংসতা এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও বিচারিক কার্যক্রমের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দলটির নেতাকর্মীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমানের দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে নতুন করে কোনো ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সহিংসতা সৃষ্টি হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জের ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগের প্রেক্ষিতে গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি হয়েছে। ফলে তার দেশে ফেরার ঘোষণা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—শীর্ষ নেতৃত্বের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের দায় কি মাঠপর্যায়ের প্রতিটি নেতাকর্মীর ওপর বর্তাবে?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে যারা কোনো অপরাধে জড়িত নন, তাদের শুধু রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে হয়রানি না করাও আইনের শাসনের অন্যতম শর্ত।

নারায়ণগঞ্জের বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই অপরাধী ও নিরীহ রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অন্যথায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন এবং অপরাধ দমনের মধ্যে সীমারেখা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমানের দেশে ফেরার ঘোষণা শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে পড়েছেন মাঠপর্যায়ের সেইসব নেতাকর্মী, যারা দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করলেও বর্তমানে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।