গ্যাস সংকট আর কতোদিন?

২–৩ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস তিতাসের

128

নিজস্ব প্রতিবেদক :

টানা তিনদিন ধরে গ্যাসের তীব্র সংকটে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের জনজীবন। শহরের বাবুরাইল, কাশিপুর, দেওভোগ, ইসদাইর, মাসদাইরসহ বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক লাইনে গ্যাসের সরবরাহ একেবারেই নেই কিংবা এতটাই কম যে রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেলের খাবার, বিস্কুট-মুড়ি কিংবা বৈদ্যুতিক ও মাটির চুলার ওপর নির্ভর করছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নিয়মিত ঘরে রান্না করা খাবারে অভ্যস্ত মানুষ হঠাৎ করে এভাবে দিনের পর দিন রান্না করতে না পারায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের পরিবারের সদস্যরা। অনেক পরিবার বাড়তি টাকা খরচ করে রেস্টুরেন্ট থেকে খাবার কিনে দিন পার করছে। গ্যাস সংকটের কারণে নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন রেস্টুরেন্টেও বেড়েছে মানুষের ভিড়।

এদিকে গ্যাসের চাপ না থাকায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিই বন্ধ রয়েছে। মাত্র তিনটি স্টেশনে সীমিতভাবে গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। এসব স্টেশনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন চালক ও যাত্রীরা।

শুধু আবাসিক গ্রাহক নয়, গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলেও। গ্যাসের অভাবে বিভিন্ন গার্মেন্টস, ডাইং ও শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিয়েও তৈরি হয়েছে শঙ্কা। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত ব্যবসা-বাণিজ্য ও শ্রমজীবী মানুষের ওপর পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।

তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি এফএসআরইউ ইউনিটে অগ্নিকাণ্ডের পর কারিগরি ত্রুটির কারণে এলএনজি সরবরাহে সাময়িক সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমানে মেরামতের কাজ চলছে। তিতাস গ্যাসের আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মনজুর আজিজ মোহনের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে নারায়ণগঞ্জে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।

তবে তিতাসের এই আশ্বাসের মধ্যেও সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও উদ্বেগ কমছে না। কারণ, গ্যাস সংকট কেবল রান্নার সমস্যা নয়—এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পরিবহন, শিল্প উৎপাদন এবং পরিবারের অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টি।

নগরবাসীর অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, একটি কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন একটি শিল্পনগরীর লাখো মানুষকে দিনের পর দিন রান্না না করে থাকতে হবে? কেন বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়নি? বিশেষ করে যারা দিন এনে দিন খান, তাদের জন্য প্রতিদিন বাইরে থেকে খাবার কেনা বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি করেছে।

গ্যাস সংকটের কারণে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। নতুন সরকারের শুরুতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় একটি মৌলিক সেবা নিয়ে এমন ভোগান্তি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে। এমনকি বিএনপির সমর্থকদের একটি অংশও পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে সরকারের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও জনসমর্থন নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ছেন বলে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

নগরবাসীর দাবি, শুধু ‘দুই-তিন দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে’—এমন আশ্বাস নয়, দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও স্থায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

কারণ, নারায়ণগঞ্জের মানুষের কাছে গ্যাস শুধু একটি জ্বালানি নয়—এটি তাদের প্রতিদিনের রান্না, জীবিকা, শিল্প-কারখানা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এখন নগরবাসীর একটাই প্রশ্ন—আর কতদিন এভাবে গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করতে হবে?