নাসিকের সীমানা সম্প্রসারণে চূড়ান্ত সুপারিশ, এখন সিদ্ধান্তের অপেক্ষা...

অপেক্ষায় তিন ইউনিয়নের মানুষ

10

রফিকুল ইনলাম জীবন :

নারায়ণগঞ্জ শহর আর কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত—এই প্রশ্নের উত্তর যেন এবার প্রশাসনিকভাবেই নির্ধারিত হতে যাচ্ছে। শহরের লাগোয়া অথচ সিটি করপোরেশনের বাইরে থাকা ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অংশ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আওতায় আনার পক্ষে চূড়ান্ত সুপারিশ করেছে জেলা প্রশাসন।

গত ৭ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন স্থানীয় সরকার বিভাগে পাঠিয়েছেন। গণশুনানি, সরেজমিন পরিদর্শন এবং ড্রোনের মাধ্যমে এলাকা পর্যবেক্ষণের পর এই সুপারিশ করা হয়েছে। এখন স্থানীয় সরকার বিভাগের সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তী প্রজ্ঞাপনের দিকে তাকিয়ে আছেন তিন ইউনিয়নের মানুষ।

প্রশ্ন উঠেছে—যে এলাকাগুলো বহু বছর ধরে বাস্তবে নারায়ণগঞ্জ নগরের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে, সেগুলো প্রশাসনিকভাবে সিটি করপোরেশনের বাইরে থাকবে আর কতদিন?

ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে ঘনবসতি, শিল্পকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আবাসিক স্থাপনা। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ এসব এলাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ শহরে যাতায়াত করেন। শহরের অর্থনীতি, পরিবহন ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে এসব এলাকার মানুষের সম্পর্কও অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।

কিন্তু নগর জীবনের বাস্তবতা আর প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রয়েছে বড় ধরনের ফারাক। একদিকে দ্রুত নগরায়ণ, অন্যদিকে সেই নগরায়ণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিকল্পিত নাগরিক অবকাঠামোর ঘাটতি—এই দ্বৈত বাস্তবতার মধ্যেই বসবাস করছেন তিন ইউনিয়নের মানুষ।

জলাবদ্ধতা, অপরিকল্পিত সড়ক ও ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা, সড়কবাতি, নাগরিক অবকাঠামোর ঘাটতিসহ নানা সমস্যার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। প্রশ্ন হচ্ছে, দ্রুত নগরায়িত এসব এলাকাকে যদি নগর পরিকল্পনার বাইরে রাখা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এর মূল্য দিতে হবে কাদের?

এই বাস্তবতার মধ্যেই জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত সুপারিশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।

গণশুনানিতে স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়া হয়েছে। পরে প্রশাসনের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে এলাকা পরিদর্শন করেছেন। ড্রোনের মাধ্যমে এলাকার বাস্তব অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এসব প্রক্রিয়া শেষে জেলা প্রশাসন তিন ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অংশ নাসিকের আওতায় আনার পক্ষে মত দিয়েছে।

এখন প্রশ্ন, সুপারিশ বাস্তবায়নে আর কত সময় লাগবে?

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বিষয়টি যেন আর কোনো প্রশাসনিক জটিলতা বা দীর্ঘসূত্রতায় আটকে না থাকে। কারণ তাদের কাছে এটি শুধু সীমানা পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি নাগরিক সেবা ও ভবিষ্যৎ নগর পরিকল্পনার প্রশ্ন।

সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে এসব এলাকায় পরিকল্পিত উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয়দের। তবে শুধু সীমানা বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না বলেও মনে করছেন অনেকে। নতুন এলাকায় নাগরিক সেবা দেওয়ার মতো সক্ষমতা, পর্যাপ্ত বাজেট, পরিকল্পিত রাস্তা-ড্রেনেজ এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান নিশ্চিত করাও জরুরি।

অর্থাৎ সামনে রয়েছে আরেকটি বড় প্রশ্ন—তিন ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনে যুক্ত হলে তাদের জন্য কী ধরনের নগর পরিকল্পনা থাকবে?

কারণ অপরিকল্পিত নগরায়ণের ওপর শুধু প্রশাসনিক সীমানা টেনে দিলে সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন হয় ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা, সড়ক যোগাযোগ, শিল্পায়ন, আবাসন, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পরিকল্পনা।

তিন ইউনিয়নের মানুষের এখন প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসনের সুপারিশ যেন দ্রুত বাস্তবায়নের পথে যায়। এ বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা প্রশাসক, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, জেলা পরিষদের প্রশাসক এবং নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (এনডিএ) চেয়ারম্যানের কার্যকর হস্তক্ষেপ চান তারা।

স্থানীয়দের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সমন্বিতভাবে উদ্যোগ নেয়, তাহলে স্থানীয় সরকার বিভাগের অনুমোদন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।

তবে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার বিভাগের। জেলা প্রশাসনের সুপারিশ এখন মন্ত্রণালয়ের টেবিলে। অনুমোদন, প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং প্রজ্ঞাপন জারির পরই বাস্তবে পরিবর্তন আসবে।

তাই ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগরের মানুষের সামনে এখন একটাই অপেক্ষা—কবে প্রশাসনিকভাবে তাদের এলাকাকে নারায়ণগঞ্জ নগরের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে?

জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত সুপারিশ সেই অপেক্ষাকে বাস্তবতার আরও কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। এখন তিন ইউনিয়নের মানুষের চোখ স্থানীয় সরকার বিভাগের সিদ্ধান্তের দিকে।