এখন কেনো এই ব্যার্থতা?

হকার উচ্ছেদ : শামীমের বিরোধীতায় ব্যার্থ আইভী, কালাম-সাখাওয়াত মিলেও কেনো ব্যার্থ হচ্ছেন?

38

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জ শহরের ফুটপাত কার—নগরবাসীর, নাকি রাজনৈতিক ক্ষমতাবানদের? এই প্রশ্ন নতুন নয়। বরং গত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ফুটপাত দখল ও হকার উচ্ছেদ এমন এক রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে, যেখানে নাগরিক অধিকার, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং রাজনৈতিক প্রভাব বারবার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কি শুধু ফুটপাতের ‘অভিভাবক’ বদলায়, নাকি সত্যিই বদলায় নগর ব্যবস্থাপনার নীতি?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নারায়ণগঞ্জের আলোচিত হকার উচ্ছেদ বিরোধী সংঘর্ষের দিকে।

২০১৭ সালের ২৫ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নগরীর ফুটপাত হকারমুক্ত করার অভিযান শুরু করেছিল। তৎকালীন মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছিলেন—ফুটপাত পথচারীদের জন্য, সেখানে হকার বসতে দেওয়া হবে না। কিন্তু তৎকালীন ক্ষমতাধর সংসদ সদস্য শামীম ওসমান হকারদের উচ্ছেদের বিরোধিতা করেন। ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু সড়কের চাষাঢ়ায় আইভীর সমর্থক ও শামীম ওসমানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে মেয়রসহ প্রায় ৫০ জন আহত হন। ওই সংঘর্ষে অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটে।

অর্থাৎ হকার উচ্ছেদের প্রশ্নটি তখন আর কেবল নগর ব্যবস্থাপনার বিষয় ছিল না; তা পরিণত হয়েছিল রাজনৈতিক ক্ষমতার সংঘাতে।

আরও গুরুতর বিষয় হলো, সে সময় দৈনিক পত্রিকার অনুসন্ধানে কয়েকজন হকারের বক্তব্যের ভিত্তিতে অভিযোগ উঠেছিল—ফুটপাতের হকারদের কাছ থেকে রাজনৈতিক নেতা ও কিছু পুলিশ সদস্য নিয়মিত অর্থ আদায় করতেন এবং এই অর্থের পরিমাণ মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এটি ছিল হকারদের বক্তব্যভিত্তিক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন; আদালত বা সরকারি তদন্তে প্রমাণিত হিসাব হিসেবে এটিকে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু অভিযোগটি একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছিল—ফুটপাত দখল কি কেবল অসহায় হকারের জীবিকার বিষয়, নাকি এর পেছনে একটি সংগঠিত অর্থনৈতিক স্বার্থও কাজ করে?

২০১৮ সালের সেই সংঘর্ষের পর কিছু সময় কঠোর অভিযান চলায় চাষাঢ়াসহ কয়েকটি এলাকা হকারমুক্ত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে আবার ফুটপাত দখল শুরু হয়। অর্থাৎ রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক অভিযান এবং ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনার অভাবে সমস্যাটি স্থায়ীভাবে সমাধান হয়নি।

এরপর আসে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক সমীকরণও পাল্টে যায়। একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে থাকা বহু স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির অবস্থান বদলে যায়—এমন অভিযোগ ও স্থানীয় রাজনৈতিক আলোচনা রয়েছে। হকারদের একটি অংশও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন আশ্রয় খুঁজেছে বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন।

যদি হকারদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা বদলে থাকে, তাহলে কি হকারি বন্ধ হয়েছে?

উত্তর হচ্ছে—না।

বরং নগরবাসীর অভিযোগ, ফুটপাত দখলের পুরনো সংস্কৃতি টিকে আছে; শুধু রাজনৈতিক পরিবেশ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমীকরণ বদলেছে। তবে নির্দিষ্ট হকার নেতা রহিম মুন্সি, আসাদসহ ব্যক্তিদের কারা কখন কী ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয় দিয়েছেন এবং এর বিনিময়ে কী পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয়েছে—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য নথি বা স্বাধীন তদন্ত ছাড়া নিশ্চিত দাবি করা যায় না। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এখন জরুরি।

২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট আবুল কালাম নির্বাচিত হন। নির্বাচনী প্রচারে নগরীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার প্রতিশ্রুতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে সামনে আসে।

এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব নেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এবার শুরু হয় নতুন করে হকার উচ্ছেদের ঘোষণা।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের যৌথ ঘোষণায় জানানো হয়, বিবি রোডে হকার, অবৈধ দখলদার ও অননুমোদিত পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে। ৫ এপ্রিলের উচ্চপর্যায়ের সভায় এমপি আবুল কালাম, নাসিক প্রশাসক, জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও র‍্যাবের উপস্থিতিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৩ এপ্রিল থেকে অভিযান শুরু হয়।

১৩ এপ্রিলের অভিযানে এমপি আবুল কালাম ও প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান একসঙ্গে মাঠে নামেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, নগরবাসীর চলাচলের স্বার্থে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে এবং শহরকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য করা হবে।

কিন্তু এখানেই পুরনো নারায়ণগঞ্জের প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে।

২০১৮ সালে যে হকার উচ্ছেদ নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল, প্রায় এক দশক পরও কেন একই প্রশ্ন নিয়ে আবার মাঠে নামতে হচ্ছে?

কার দায়?

শুধু হকারদের?

নাকি তাদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের?

নাকি সেই প্রশাসনের, যারা বছরের পর বছর ফুটপাত দখল হতে দিয়েছে?

নাকি সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির, যেখানে ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলে জনসাধারণের চলাচলের জায়গাও অর্থ উপার্জনের সুযোগে পরিণত হয়?

বর্তমান প্রশাসনের অভিযান নিয়ে প্রশ্নও ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে। মে মাসে উচ্ছেদকর্মীদের ওপর হকারদের হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। জুনে কালিবাজার এলাকায় অভিযান চালানোর সময় নাসিক প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান হকারদের বাধার মুখে পড়েন। অর্থাৎ ঘোষণা ও অভিযান হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান এখনও নিশ্চিত হয়নি।

এদিকে নাসিক হকারদের পুনর্বাসনের কথাও বলেছে। আগস্টে রেলওয়ের জমিতে হকার পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নাসিক প্রশাসকের বিরোধের খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এতে আরেকটি বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে—হকার উচ্ছেদ শুধু অভিযান চালিয়ে শেষ করার বিষয় নয়; পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মস্থল, সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত নজরদারির সমন্বিত পরিকল্পনাও প্রয়োজন।

তাহলে আওয়ামী লীগ আমল এবং বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য কোথায়?

আওয়ামী লীগ আমলে দেখা গেছে, একজন জনপ্রতিনিধি ফুটপাত দখলমুক্ত করতে চেয়েছেন, আর একই দলের আরেক প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধির অবস্থান ছিল হকারদের পক্ষে। সেই রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব একসময় রাস্তায় সংঘর্ষে গড়ায়। এর ফলে ফুটপাতের প্রশ্নটি নাগরিক অধিকার থেকে রাজনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের প্রশ্নে পরিণত হয়েছিল।

বর্তমান সময়ে দেখা যাচ্ছে, নির্বাচনের পর একই শহরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব একসঙ্গে দাঁড়িয়ে হকার উচ্ছেদের ঘোষণা দিচ্ছেন। এটি অবশ্যই আগের অবস্থানের তুলনায় ভিন্ন রাজনৈতিক চিত্র। কিন্তু ঘোষণাই শেষ কথা নয়। কারণ নগরবাসী এখন জানতে চাইছে—এই অভিযান কি সত্যিই স্থায়ী হবে, নাকি কিছুদিন পর আবার ফুটপাত ফিরে যাবে আগের অবস্থায়?

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—হকার উচ্ছেদ যদি সত্যিই হয়, তাহলে ফুটপাতের দখল থেকে যে অর্থনৈতিক সুবিধা এতদিন তৈরি হয়েছে, সেই অর্থের প্রবাহ বন্ধ হবে কীভাবে?

যদি কোনো রাজনৈতিক নেতা, স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, সংগঠনের নেতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য অবৈধভাবে ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে অর্থ আদায় করে থাকেন, তাহলে শুধু হকার উচ্ছেদ করে সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন অর্থ আদায়ের পেছনে থাকা ব্যক্তি ও নেটওয়ার্ক শনাক্ত করা। একই সঙ্গে যারা রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে ফুটপাতের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও একই আইন প্রয়োগ করতে হবে।

কারণ একজন গরিব হকারকে উচ্ছেদ করে আরেকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে একই জায়গার নিয়ন্ত্রণ দিলে সেটি হকার উচ্ছেদ নয়—শুধু দখলের মালিকানা পরিবর্তন।

নারায়ণগঞ্জবাসী তাই এবার দেখতে চায়, ফুটপাত কি সত্যিই জনগণের কাছে ফিরবে, নাকি আবারও কোনো রাজনৈতিক দলের ছত্রচ্ছায়ায় নতুন হকার নেতৃত্ব, নতুন চাঁদাবাজি এবং নতুন দখলদারির জন্ম হবে।

২০১৮ সালের সংঘর্ষ নারায়ণগঞ্জকে দেখিয়েছে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় ফুটপাত দখলের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। ২০২৬ সালের অভিযান বর্তমান নেতৃত্বকে আরেকটি সুযোগ দিয়েছে—অতীতের সেই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি স্বচ্ছ, দলনিরপেক্ষ ও দীর্ঘস্থায়ী নগর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার।

এবার তাই শুধু হকার উচ্ছেদ নয়, প্রশ্ন উঠেছে—ফুটপাতের পেছনের ক্ষমতার রাজনীতি উচ্ছেদ হবে কবে?

নারায়ণগঞ্জের মানুষ সেই উত্তরই দেখতে চায়।