স্থানীয় এমপি, প্রশাসক, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের হস্তক্ষেপ কামনা...

টানবাজারে চাঁদাবাজির আতঙ্ক: স্বামী-স্ত্রীর ‘সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কে’ জিম্মি সুতা ব্যবসায়ীরা!

846

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জ শহরের অন্যতম বৃহৎ সুতা ব্যবসার কেন্দ্র টানবাজারে নতুন করে চাঁদাবাজির আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে এক দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় একটি শক্তিশালী সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কুটি পাড়াসহ টানবাজারের বিভিন্ন এলাকায় সুতা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বেপরোয়াভাবে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, অভিযুক্ত দম্পতির সঙ্গে থাকা একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপের সদস্যরা প্রকাশ্যে এলাকায় ঘোরাফেরা করেন এবং ব্যবসায়ীদের ওপর নানা ধরনের চাপ সৃষ্টি করেন। কেউ দাবিকৃত চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে নাজেহাল ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অনেক ব্যবসায়ী নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীদের অনেকেই অভিযোগের কথা বললেও প্রকাশ্যে অভিযুক্তদের নাম বলতে সাহস করছেন না। তাদের ভাষ্য, নাম প্রকাশ করলে পরবর্তীতে আরও হয়রানি বা হামলার শিকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

টানবাজারের কুটি পাড়ার কয়েকজন সুতা ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সেখানে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ গ্রুপ নিয়মিত তৎপরতা চালিয়ে আসছে বলে তারা অভিযোগ করেন। ব্যবসায়ীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়ধারী এক ব্যক্তির স্ত্রী এই গ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।

এক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা এখন একেবারেই জিম্মি হয়ে পড়েছি। কারও বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস নেই। প্রশাসন যদি গোপনে খোঁজ নেয়, তাহলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”

আরেক ব্যবসায়ীর অভিযোগ, চাঁদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয়। কখনো ভয় দেখানো, কখনো দোকানে লোক পাঠানো কিংবা ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে গিয়ে নাজেহাল করার মতো ঘটনা ঘটছে বলেও তিনি দাবি করেন।

তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও এই প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি।

টানবাজারের সুতা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইয়ার্ন মার্চেন্ট এসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের দাবি, কথিত সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে সংগঠনের নেতারাও অনেকটা নীরব ভূমিকা পালন করছেন। ফলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা নিজেদের সমস্যার কথা বলার মতো কার্যকর কোনো জায়গা পাচ্ছেন না।

ব্যবসায়ীদের প্রশ্ন—একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক এলাকায় যদি সংঘবদ্ধভাবে চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারি নেই কেন?

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা সরকারের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরদারি জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সামান্য সময়ের জন্য টানবাজারের কুটি পাড়া ও আশপাশের এলাকায় গোপনে নজরদারি করলেই চাঁদাবাজির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।

একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, “আমরা কারও বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করতে চাই না। প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো নিজেরা তদন্ত করুক। দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলুক, কারা এলাকায় ঘোরাফেরা করে, কারা টাকা নেয়—সবকিছু খতিয়ে দেখলেই প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।”

বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের নিরাপত্তা ও ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ব্যবসায়ীরা।

এক ব্যবসায়ী বলেন, “এখন আমাদের অভিভাবক এডভোকেট আবুল কালাম ও এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সাহেব। প্রশাসনিক দায়িত্বে আছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার মহোদয়। তারা যদি নিজ নিজ মাধ্যমে খবর নেন, তাহলে আমাদের অভিযোগের সত্যতা পেয়ে যাবেন।”

ব্যবসায়ীদের দাবি, তাদের বক্তব্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রকাশ্য বক্তব্যের পরিবর্তে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গোপন অনুসন্ধান করা হলে প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

টানবাজার নারায়ণগঞ্জের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র। এখানে সুতা ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষ যুক্ত। ফলে এমন একটি এলাকায় সংঘবদ্ধ চাঁদাবাজি বা সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগ উঠলে তা শুধু ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তার বিষয় নয়, বরং পুরো বাণিজ্যিক পরিবেশের জন্যও উদ্বেগের।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে কুটি পাড়া ও টানবাজার এলাকায় নজরদারি, ব্যবসায়ীদের পৃথকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ এবং অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ সত্য হলে চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী তৎপরতার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট করা জরুরি।

টানবাজারের ব্যবসায়ীদের এখন একটাই প্রত্যাশা—অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রশাসন দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং কোনো রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব যেন আইনের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। ##