নারায়ণগঞ্জের ভাগ্য

সাখাওয়াৎ, মামুন, রাজীবকে নিয়ে জনগণের মাঝে ব্যাপক প্রত্যাশা...

নারায়ণগঞ্জের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সুযোগ তিন নেতার হাতে

156

নিজস্ব প্রতিবেদক :

শিল্প, বাণিজ্য, নদী, বন্দর ও কর্মসংস্থানের জন্য দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জেলা নারায়ণগঞ্জ। অথচ অর্থনৈতিক গুরুত্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে ওঠেনি এর নাগরিক অবকাঠামো। অপরিকল্পিত নগরায়ন, যানজট, জলাবদ্ধতা, দখল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, সংকুচিত খাল-নদী, অপর্যাপ্ত সড়ক, আবাসন সংকট এবং পরিকল্পনাহীন শিল্পায়ন—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই নানা সমস্যায় জর্জরিত নারায়ণগঞ্জ।

এই বাস্তবতায় ২০২৬ সালে নারায়ণগঞ্জের সামনে তৈরি হয়েছে একটি নতুন সুযোগ। নগর ব্যবস্থাপনা, জেলা পর্যায়ের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ তিনটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এখন তিন ব্যক্তির হাতে। তারা হলেন—নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ এবং নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাসুকুল ইসলাম রাজীব।

তিনজনের দায়িত্ব আলাদা। কিন্তু তাদের কাজের বড় একটি অংশ একই ভূখণ্ডের মানুষের জীবন ও ভবিষ্যতের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এই তিন প্রতিষ্ঠান যদি সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে কি নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন-অব্যবস্থাপনার অবসান ঘটানো সম্ভব?

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নগরবাসীর দৈনন্দিন নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা। তিনি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নাসিক প্রশাসকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

রাস্তা, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিচ্ছন্নতা, সড়কবাতি, নাগরিক অবকাঠামো, জনস্বাস্থ্যসহ সিটি করপোরেশনের আওতাধীন বিভিন্ন সেবা কার্যকরভাবে পরিচালনা করা তাঁর প্রশাসনের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।

এরই মধ্যে তিনি নারায়ণগঞ্জকে ‘গ্রিন অ্যান্ড ক্লিন সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলেছেন।

কিন্তু শুধু পরিচ্ছন্নতা অভিযান কিংবা বিচ্ছিন্নভাবে রাস্তা মেরামত করলেই একটি আধুনিক নগর গড়ে উঠবে না। কোথায় রাস্তা হবে, কোথায় ড্রেন থাকবে, কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় শিল্পকারখানা, কোথায় পার্ক বা উন্মুক্ত স্থান থাকবে—এসবের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনাকে যুক্ত করতে হবে।

সেখানেই নাসিক প্রশাসনের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি।

অপরদিকে অধ্যাপক মামুন মাহমুদ ১৬ মার্চ ২০২৬ থেকে নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জেলা পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইটেও তাঁর নাম প্রশাসক হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

জেলা পরিষদ সিটি করপোরেশনের বিকল্প কোনো প্রতিষ্ঠান নয়। এর নিজস্ব আইনগত কাঠামো, সম্পদ ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড রয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে অবকাঠামো ও জনকল্যাণমূলক কাজে জেলা পরিষদের ভূমিকা রয়েছে।

ফলে মামুন মাহমুদের সামনে বড় সুযোগ হচ্ছে—সিটি করপোরেশনের বাইরের নারায়ণগঞ্জের বিস্তৃত এলাকাগুলোতেও উন্নয়নকে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে নেওয়া।

বিশেষ করে ইউনিয়ন, উপজেলা ও নগর এলাকার পারস্পরিক সংযোগ, সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা ও সামাজিক অবকাঠামো, জনকল্যাণমূলক প্রকল্প এবং জেলা পর্যায়ের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে একটি সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

জেলা পরিষদকে জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার লক্ষ্যও তিনি প্রকাশ করেছেন।

এদিকে তিন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কৌশলগত ভূমিকা নিতে পারে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা এনডিএ।

২০২৬ সালে গঠিত এই কর্তৃপক্ষের মূল লক্ষ্য নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের এলাকাকে পরিকল্পিত, আধুনিক ও টেকসই নগর ব্যবস্থার আওতায় আনা। সরকারের পক্ষ থেকেও অপরিকল্পিত নগরায়ন রোধ, পরিবেশের ভারসাম্য, দুর্যোগ সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা এবং উন্নত নাগরিক জীবন নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে।

জুনে মাসুকুল ইসলাম রাজীবকে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়।

এ দায়িত্বের গুরুত্ব অনেক বেশি। কারণ নারায়ণগঞ্জের আগামী ২০-৩০ বছরের নগর কাঠামো কেমন হবে, কোথায় আবাসিক এলাকা হবে, কোথায় শিল্প এলাকা থাকবে, কীভাবে সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে, জলাবদ্ধতা ও পরিবেশগত ঝুঁকি কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এসব দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সঙ্গে এনডিএ সরাসরি সম্পর্কিত।

অর্থাৎ আজকের একটি রাস্তা বা ড্রেনের চেয়ে আগামী দিনের নারায়ণগঞ্জ কেমন হবে—সেই বড় প্রশ্নটির সঙ্গে এনডিএ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে বড় সমস্যা সম্ভবত উন্নয়ন প্রকল্পের অভাব নয়; বরং পরিকল্পনার অভাব এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতা।

একটি রাস্তা তৈরি হলো, কিছুদিন পর সেটি কেটে ড্রেন করা হলো। ড্রেনের পর আবার গ্যাস, পানি কিংবা বিদ্যুতের লাইন বসানোর জন্য রাস্তা কাটা হলো। কোথাও খাল ভরাট হয়ে গেল, কোথাও জলাবদ্ধতা তৈরি হলো, আবার অন্যদিকে নতুন আবাসিক এলাকা গড়ে উঠল কোনো সামগ্রিক পরিকল্পনা ছাড়াই।

এই বাস্তবতায় নাসিক, জেলা পরিষদ এবং এনডিএ যদি নিজেদের মতো করে আলাদা আলাদা কাজ করে, তাহলে উন্নয়নের অর্থ অপচয়ের পাশাপাশি সমস্যা আরও বাড়তে পারে।

কিন্তু তিন প্রতিষ্ঠান যদি একটি সমন্বিত উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে আসে, তাহলে পরিস্থিতি বদলাতে পারে।

সাখাওয়াত হোসেন খান দেখবেন নগরবাসী আজ কী নাগরিক সেবা পাচ্ছেন।
মামুন মাহমুদ দেখবেন জেলা পর্যায়ে উন্নয়ন কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে।
আর মাসুকুল ইসলাম রাজীবকে ভাবতে হবে আগামী দিনের নারায়ণগঞ্জ কেমন হবে।

এই তিনটি দায়িত্বকে এক সুতোয় বাঁধতে পারলেই তৈরি হতে পারে একটি কার্যকর উন্নয়ন মডেল।

এদিকে এই তিন প্রতিষ্ঠানের সামনে এখন কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নও রয়েছে।

প্রথমত, নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি বাস্তবসম্মত দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে?

দ্বিতীয়ত, জলাবদ্ধতা নিরসনে শুধু ড্রেন নির্মাণ নয়—খাল, জলাধার ও প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে?

তৃতীয়ত, শিল্পনগরীর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বজায় রেখে পরিবেশ ও নাগরিক জীবনের ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে?

চতুর্থত, নারায়ণগঞ্জ শহর ও আশপাশের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোকে ভবিষ্যতের নগর কাঠামোর সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা হবে?

পঞ্চমত, বিভিন্ন সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় কে করবে এবং সেই সমন্বয়ের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত হবে?

এদিকে তিন দায়িত্বশীল ব্যক্তিরই রাজনৈতিক পরিচয় রয়েছে—এ তথ্য প্রকাশ্য। সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নাসিক প্রশাসক হয়েছেন। মামুন মাহমুদ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মাসুকুল ইসলাম রাজীব জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক এবং বর্তমানে এনডিএ চেয়ারম্যান।

কিন্তু প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণের পর তাদের মূল্যায়নের প্রধান মাপকাঠি হওয়া উচিত রাজনৈতিক পরিচয় নয়—কাজের ফলাফল।

মানুষ দেখতে চায় রাস্তা ঠিক হচ্ছে কি না, জলাবদ্ধতা কমছে কি না, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত হচ্ছে কি না, দখল ও অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে কি না, নতুন প্রজন্মের জন্য খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান থাকছে কি না এবং আগামী দিনের নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে কি না।

অপরদিকে নারায়ণগঞ্জবাসীর ভাগ্য আসলে কোনো এক ব্যক্তি বা তিন ব্যক্তির হাতে নয়। তবে বর্তমান সময়ে এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের হাতে নারায়ণগঞ্জের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ রয়েছে।

তাদের সামনে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা ধরে রাখার চেয়েও বড় পরীক্ষা হলো—দল-মত, ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া।

যদি সাখাওয়াত হোসেন খান নাগরিক সেবাকে আরও কার্যকর করেন, অধ্যাপক মামুন মাহমুদ জেলা পরিষদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে স্বচ্ছ ও জনমুখী করেন এবং মাসুকুল ইসলাম রাজীব নারায়ণগঞ্জের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি নগর পরিকল্পনা দাঁড় করাতে পারেন—তাহলে এই সময়টি নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

আর যদি তিন প্রতিষ্ঠান নিজেদের আলাদা বলয়ে থেকে কাজ করে, সমন্বয় না হয় এবং উন্নয়ন আবারও খণ্ডিত প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নতুন প্রতিষ্ঠান ও নতুন নেতৃত্বের পরও পুরোনো সমস্যাগুলোই ফিরে আসবে।

তাই এখন নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা একটাই—তিন চেয়ার, তিন প্রতিষ্ঠান, কিন্তু উন্নয়নের লক্ষ্য যেন হয় এক।

কারণ নারায়ণগঞ্জের মানুষ আর শুধু প্রতিশ্রুতি চায় না; তারা চায় একটি পরিকল্পিত, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব, যানজটমুক্ত এবং বাসযোগ্য নারায়ণগঞ্জ। ##