অবশেষে আইভীর মুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই

212

স্টাফ রিপোর্টার :

দীর্ঘ কয়েক মাসের কারাবাস, একের পর এক মামলা, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের ধারাবাহিক শুনানি এবং রাজনৈতিক উত্তেজনায় টানা আলোচনার পর অবশেষে মুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অধিকাংশ মামলায় জামিন বহাল থাকায় আগামী দুই এক দিনের মধ্যেই তিনি কারামুক্ত হতে পারেন। তার কারামুক্তিতে আর কোনো বাধা নেই বলে জানিয়েছেন তার আইনজীবী এডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম।

তিনি জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের ৯ মে ভোররাত প্রায় ৩টা থেকে শুরু হওয়া দীর্ঘ অভিযানের পর সকাল পৌনে ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকায় অবস্থিত তার বাসভবন ‘চুনকা কুটির’ থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানিয়েছিল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যা, হামলা ও নাশকতার ঘটনায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় তার বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি মামলা ছিল বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

আইভীর গ্রেপ্তারের খবরে সেদিন রাতেই দেওভোগ এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষ তার বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে প্রতিবাদ জানান। পুলিশের সঙ্গে সমর্থকদের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও উত্তেজনাকর পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।

গ্রেপ্তারের পর তাকে প্রথমে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনায় দায়ের হওয়া তিনটি হত্যা মামলা ও দুটি হত্যাচেষ্টা মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে একের পর এক নতুন মামলায় তাকে “শোন অ্যারেস্ট” দেখানো হতে থাকে। ফলে একটি মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় পুনরায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে তাকে কারাগারে আটকে রাখা হয়। বিষয়টি নিয়ে তার আইনজীবীরা আদালতে “উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়রানি”র অভিযোগ তোলেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ৯ নভেম্বর প্রথম দফায় পাঁচ মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পান আইভী। কিন্তু ওইদিনই তাকে আরও পাঁচ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পরে চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি নতুন পাঁচ মামলায়ও ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পান তিনি। এরপর আবার সিদ্ধিরগঞ্জ থানার পৃথক দুটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এসব মামলার একটিতে ২ মার্চ এবং অন্যটিতে ১২ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।

পরবর্তীতে হাইকোর্ট একের পর এক মামলায় তাকে জামিন দিতে থাকেন। গত ১০ মে আপিল বিভাগ তার বিরুদ্ধে থাকা ১০টি মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন। এছাড়া সিদ্ধিরগঞ্জ থানার আরও দুটি মামলায় দেওয়া জামিন স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনও চেম্বার আদালত খারিজ করে দেন। ফলে বর্তমানে তার মুক্তিতে আর কোনো কার্যকর আইনি বাধা নেই বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।

আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, আদালতের আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র কারাগারে পৌঁছানো এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই মুক্তি পাবেন আইভী। ইতোমধ্যে তার পরিবার, অনুসারী এবং রাজনৈতিক সহকর্মীদের মধ্যে স্বস্তি ও উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় তার সম্ভাব্য মুক্তিকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আইভীর মুক্তি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্থানীয় রাজনীতির একটি প্রভাবশালী ও আলোচিত মুখ। উন্নয়ন, নাগরিক সেবা ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে যেমন তিনি জনপ্রিয়তা পেয়েছেন, তেমনি বিভিন্ন সময় ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব ও রাজনৈতিক সংঘাতের কারণেও জাতীয় আলোচনায় ছিলেন।

২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে তার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়। পরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠনের পর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশের অন্যতম আলোচিত নারী রাজনৈতিক নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পান। কারামুক্তির পর তিনি আবারও সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন কিনা, সেটিই এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।