রফিকুল ইসলাম জীবন
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের ঘিরে আজও আলোচনা-সমালোচনা থামেনি। তাদেরই একজন বিএনপির পদহীন নেতা জাকির খান। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর তিনি আবারও নারায়ণগঞ্জে ফিরেছেন। দলীয় কোনো পদে না থাকলেও নগরীর একটি অংশে তার প্রভাব রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে।
তবে নতুন প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, কীভাবে একজন কিশোর রাজনৈতিক কর্মী একসময় নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে আলোচিত নেতাদের একজন হয়ে উঠেছিলেন এবং পরে কেন তার সেই জনপ্রিয়তার পতন ঘটে।
স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, আশির দশকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে প্রয়াত নাসিম ওসমানের সান্নিধ্যেই রাজনীতিতে সক্রিয় হন জাকির খান। সে সময় তিনি ছিলেন একেবারেই তরুণ। দেওভোগের প্রভাবশালী পরিবারের সদস্য হওয়ায় জাকির খান এবং বদিউজ্জামান বদুকে নাসিম ওসমান গুরুত্ব দিতেন বলে স্থানীয় প্রবীণ রাজনৈতিক নেতারা জানান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আশির দশকের শেষভাগ এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতে নারায়ণগঞ্জে শক্তি প্রদর্শন ও সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিস্তারের অভিযোগ ওঠে। সেই সময় নাসিম ওসমানের আশপাশে সারোয়ার, লাল, নিয়াজুল, মাকসুদসহ আরও কয়েকজনের উত্থান ঘটে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত রয়েছে। তবে এসব মূল্যায়ন রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী এবং মতিন চৌধুরী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, ওই সময় মতিন চৌধুরীর উদ্যোগেই বিএনপিতে যোগ দেন জাকির খান ও বদিউজ্জামান বদু।
অন্যদিকে একই সময়ে তোলারাম কলেজকেন্দ্রিক রাজনীতিতে শামীম ওসমানের প্রভাব বাড়তে থাকে। নব্বইয়ের দশকে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের মধ্যে একাধিক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যা জাতীয় রাজনীতিতেও আলোচিত হয়।
১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং শামীম ওসমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তাকে ঘিরে বিভিন্ন জাতীয় সংবাদমাধ্যমে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যেখানে তাকে “গডফাদার” আখ্যায় উল্লেখ করা হয়েছিল। একই সময়ে ফেনীর তৎকালীন সংসদ সদস্য জয়নাল হাজারীকেও ঘিরে অনুরূপ বিতর্ক তৈরি হয়। তবে এগুলো ছিল তৎকালীন গণমাধ্যমের প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক বিতর্কের অংশ।
এই সময় থেকেই শামীম ওসমানের অন্যতম রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন জাকির খান। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়তে থাকে।
সে সময় নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সভাপতি ছিলেন বর্তমান মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি, টিপুর সঙ্গে বিরোধের জেরে দলের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে তাকে সরিয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব দেওয়া হয় জাকির খানকে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় জাকির খান গ্রেপ্তার হন। তার সমর্থকদের দাবি, কারাগারে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। যদিও সে সময়ের সরকারের অবস্থান ছিল ভিন্ন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গ্রেপ্তার ও কারাবাসই জাকির খানের জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়। অনেকের মতে, সেই সময় তিনি নারায়ণগঞ্জে বিএনপির সবচেয়ে জনপ্রিয় তরুণ নেতাদের একজন হয়ে ওঠেন।
২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় এলে কারামুক্ত হন জাকির খান। মুক্তির পর নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি এলাকায় তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই অনুষ্ঠানে নজিরবিহীন জনসমাগম হয়েছিল। অনেকেই এটিকে জাকির খানের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
কিন্তু সেই জনপ্রিয়তা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেননি তিনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে শক্তির ভারসাম্য পরিবর্তন হতে থাকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যুবদল নেতা মমিন উল্লাহ ডেভিড এবং ছাত্রদল নেতা জাকির খানকে ঘিরে নগরীতে দুটি পৃথক প্রভাববলয় তৈরি হয়। উত্তরাংশে ডেভিড এবং দক্ষিণাংশে জাকির খানের অনুসারীদের প্রভাব বাড়তে থাকে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে সন্ত্রাস দমনের ঘোষণা দেন। প্রথমে সতর্কবার্তা, পরে ‘অপারেশন ক্লিনহার্ট’ এবং পরবর্তীতে র্যাব গঠনের মাধ্যমে দেশব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান শুরু হয়।
সেই অভিযানের প্রভাব পড়ে নারায়ণগঞ্জেও। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়। একাধিক ব্যক্তি বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারে নিহত হন। সেই সময় যুবদল নেতা মমিন উল্লাহ ডেভিডও নিহত হন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ার পর জাকির খান দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান বলে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
ফলে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গ্রেপ্তার ও কারাবাসের কারণে জনপ্রিয়তার শীর্ষে ওঠা জাকির খানের রাজনৈতিক প্রভাবের অবনতি শুরু হয় বিএনপি সরকারের সময়েই।
দীর্ঘ সময় পর তিনি আবারও নারায়ণগঞ্জে ফিরেছেন। কিন্তু এখন তিনি কী করছেন? তার রাজনৈতিক অবস্থান কোথায়? তিনি কি আবারও রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন?




