উন্নয়ন বঞ্চিত ফতুল্লা : আন্দোলন করানো হয়েছিলো সিটি করপোরেশনে যাওয়ার বিরুদ্ধে!

168

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আওতাভুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েনে পিছিয়ে পড়ে ফতুল্লা থানার চারটি ইউনিয়ন এবং গোগনগর ইউনিয়নের উন্নয়ন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক যুগ আগে তৎকালীন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর উদ্যোগে গোগনগরসহ ফতুল্লা থানার কয়েকটি ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। সে সময় নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক ছিলেন মনোজ কান্তি বড়াল।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এলাকার সম্ভাব্যতা যাচাই ও অ্যাসেসমেন্টের কাজ এগিয়ে যায়। তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়ার আগ মুহূর্তে তৎকালীন সংসদ সদস্য শামীম ওসমান বিষয়টি জানতে পেরে এর বিরোধিতা করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, তিনি মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ফাইল স্থগিত করার উদ্যোগ নেন এবং ফতুল্লা এলাকায় বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি রয়েছে—এমন যুক্তি তুলে ধরে পুনঃতদন্তের দাবি জানান। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তৎকালীন জেলা প্রশাসককে পুনরায় তদন্ত ও অ্যাসেসমেন্টের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে, ওই পুনঃতদন্তের প্রতিবেদনের কারণে ফতুল্লা ও গোগনগরসহ সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের জন্য আটকে যায়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আন্দোলন হয়েছিল সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধেও

স্থানীয়দের ভাষ্য, পরবর্তীতে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ আবার সক্রিয় হলে তৎকালীন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একটি অংশ এর বিরোধিতা করে মাঠে নামে।

তখন উপজেলা চেয়ারম্যান আজাদ বিশ্বাস, কাশীপুর ইউনিয়নের প্রয়াত চেয়ারম্যান সাইফ উল্লাহ বাদল, এনায়েতনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান, ফতুল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান স্বপন এবং কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুসহ বিভিন্ন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের অংশগ্রহণে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করা হয় বলে স্থানীয়রা জানান।

তবে আজাদ বিশ্বাস এবং মনিরুল আলম সেন্টু এখন সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভূক্তির পক্ষে অবস্থা নিয়েছেন।

এই সময় কয়েকটি গণমাধ্যমে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির বিরোধিতার বিষয়টি নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও কার্যকর কোনো পরিবর্তন আসেনি বলে দাবি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

উন্নয়নবঞ্চনার অভিযোগ

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ইউনিয়ন পরিষদের কাঠামোর মধ্যে থাকায় দ্রুত নগরায়ন হওয়া ফতুল্লা ও গোগনগর এলাকায় পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন হয়নি।

তাদের দাবি, অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেনেজ ব্যবস্থার দুর্বলতা, জলাবদ্ধতা, রাস্তাঘাটের সমস্যা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সংকট বছরের পর বছর ধরে মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।

একাধিক বাসিন্দা বলেন, নারায়ণগঞ্জ শহরের পাশে থেকেও ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকাগুলো নাগরিক সুবিধার দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে। তাদের মতে, সিটি করপোরেশনের আওতায় এলে পরিকল্পিত উন্নয়নের সুযোগ বাড়বে।

আইভীর উদ্যোগ সফল হয়নি

স্থানীয়দের দাবি, পরবর্তীতে ফতুল্লা ও আশপাশের এলাকার মানুষ সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে তৎকালীন মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর কাছে গেলেও রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বিষয়টির সমাধান হয়নি।

তবে সাবেক মেয়র আইভীর ঘনিষ্ঠ মহলের দাবি, নগর সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি সবসময় ইতিবাচক ছিলেন এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ওপরই বিষয়টি নির্ভর করত।

পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন প্রত্যাশা

গত কয়েক বছরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের পর ফতুল্লা, কাশীপুর, এনায়েতনগর, কুতুবপুর এবং গোগনগরের বাসিন্দাদের মধ্যে নতুন করে আশাবাদ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয়রা মনে করছেন, এবার রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে জনস্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে নগর সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তাদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের উন্নয়নবঞ্চনার অবসান ঘটিয়ে এসব ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্পসমৃদ্ধ এলাকাকে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হবে।

একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষায়,
“আমরা শহরের পাশে থেকেও বছরের পর বছর নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এখন আশা করছি, জনগণের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান হবে।”