এক সময়ের নেতা-অনুসারী, এখন দুই মেরুতে জাকির খান ও সাদেক

207

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে গত তিন দশকে অনেক নেতা এসেছেন, অনেকেই হারিয়ে গেছেন। কেউ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থান শক্ত করেছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আজও আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন। এমনই দুই পরিচিত মুখ সাবেক জেলা ছাত্রদল সভাপতি জাকির খান এবং বর্তমান জেলা যুবদলের আহ্বায়ক সাদেকুর রহমান সাদেক। এক সময়ের নেতা ও ঘনিষ্ঠ অনুসারী—আজ একই দলে থেকেও তারা কার্যত দুই ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের প্রতিনিধিত্ব করছেন।

এক সময় জাকির খানের ছায়াসঙ্গী হিসেবে পরিচিত সাদেকুর রহমান সাদেক বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সর্বোচ্চ সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় দেশছাড়া থাকার পর রাজনীতিতে ফিরে আসা জাকির খানের কোনো সাংগঠনিক পদ না থাকলেও শহরের একটি অংশে এখনও তার ব্যক্তিগত প্রভাব রয়েছে। ফলে একই শহরে বসবাস করলেও তাদের রাজনৈতিক পথ এখন সম্পূর্ণ আলাদা।

সাদেকুর রহমান সাদেকের পৈতৃক বাড়ি আড়াইহাজার উপজেলায়। তবে বহু বছর আগে তার পরিবার ফতুল্লার কাশীপুর ইউনিয়নের বাংলাবাজার এলাকায় বসতি স্থাপন করে। এরপর থেকেই তিনি বাংলাবাজারের বাসিন্দা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। অন্যদিকে জাকির খানের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ আখড়া এলাকায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জাতীয় পার্টির রাজনীতি ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে আলোচিত নেতা হয়ে ওঠেন।

রাজনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, সাদেকের রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার শুরুটাই হয়েছিল জাকির খানের হাত ধরে। জাকির যেখানেই সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতেন, সেখানেই সাদেককে তার অন্যতম বিশ্বস্ত কর্মী হিসেবে দেখা যেত। সে সময় তাদের সম্পর্ক ছিল অনেকটা রাজনৈতিক গুরু-শিষ্যের মতো।

১৯৯১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিন চৌধুরীর হাত ধরে জাকির খান বিএনপির মূলধারার রাজনীতিতে আরও দৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত হন। তার সঙ্গে সাদেকও বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই জাকির খানের অনুসারী তরুণদের মধ্যে সাদেক একটি পরিচিত মুখে পরিণত হন।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের সঙ্গে জাকির খানের রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র আকার ধারণ করে। সে সময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি প্রায় প্রতিদিনই সংঘর্ষ, মামলা ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তপ্ত থাকত। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় জাকির খান ও তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে একের পর এক নাশকতা ও বিস্ফোরক আইনের মামলা হয়। সেসব মামলার আসামির তালিকায় সাদেকুর রহমান সাদেকের নামও ছিল।

পরবর্তীতে জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে সরিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হলে সভাপতি করা হয় জাকির খানকে। যদিও টিপুকে কেন সরানো হয়েছিল, তা নিয়ে দলীয় রাজনীতিতে আজও নানা আলোচনা রয়েছে। সেই কমিটিতে যুগ্ম সম্পাদক হন সাদেকুর রহমান সাদেক। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটিই ছিল সাদেকের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। কারণ, ওই কমিটির মাধ্যমে তিনি প্রথমবারের মতো জেলা পর্যায়ের নেতৃত্বে উঠে আসেন।

সেই সময় দেওভোগ এলাকার আলাউদ্দিন খন্দকার শিপন ও ফরিদের মতো বয়সে জাকির খানের চেয়ে বড় নেতারাও তার নেতৃত্ব মেনে সংগঠন পরিচালনা করতেন। ফলে জাকির খানের নেতৃত্বাধীন ছাত্রদল তখন নারায়ণগঞ্জে বিএনপির অন্যতম শক্তিশালী রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছিল। আর সেই বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক ছিলেন সাদেক।

তবে ২০০১ সালে বিএনপি পুনরায় রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তন আসতে শুরু করে। বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনার প্রেক্ষাপটে জাকির খানের সঙ্গে তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধাদের দূরত্ব তৈরি হয়। সাদেক, আলাউদ্দিন খন্দকার শিপন ও ফরিদসহ তার বেশ কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ধীরে ধীরে জাকির খানের বলয় থেকে সরে আসেন।

এরপর শুরু হয় সাদেকের রাজনৈতিক জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়।

নিজের পৈতৃক এলাকা আড়াইহাজারের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম আজাদের নেতৃত্বে রাজনীতি শুরু করেন তিনি। শহরের পাশাপাশি আড়াইহাজারেও সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাদেকের সাংগঠনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের মাঠের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে সামনে নিয়ে আসার পরিকল্পনা ছিল আজাদের।

এদিকে বিএনপি সরকারের শেষ সময়ে দেশব্যাপী সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু হলে মমিন উল্লা ডেভিডসহ বিএনপির বেশ কয়েকজন নেতা নিহত হন। প্রবীণ সাংবাদিক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় জাকির খানকে গ্রেপ্তারের জন্যও ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। একপর্যায়ে তিনি দেশ ছেড়ে চলে যান। এরপর আওয়ামী লীগের দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছরের শাসনামলে তিনি দেশে ফিরতে পারেননি।

এই দীর্ঘ সময়টিই সাদেকের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ, জাকির খানের অনুপস্থিতিতে তিনি নজরুল ইসলাম আজাদের নেতৃত্বে নিজের সাংগঠনিক অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী করতে থাকেন। বিএনপির বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম, দলীয় কর্মসূচি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিয়মিত অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি জেলা পর্যায়ে নিজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করেন।

দলীয় সূত্র জানায়, সাদেককে জেলা যুবদলের শীর্ষ নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে নজরুল ইসলাম আজাদ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়েছেন। শুরুতে সেই প্রচেষ্টা সফল না হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি জেলা যুবদলের আহ্বায়কের দায়িত্ব পান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই পদ লাভের মাধ্যমে সাদেক কেবল একজন সাবেক ছাত্রনেতা নন, বরং জেলা বিএনপির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের অন্যতম দাবিদার হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পান।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাকির খান আবার দেশে ফিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। যদিও বর্তমানে তার হাতে কোনো সাংগঠনিক পদ নেই, তবুও শহরের একটি অংশে তার ব্যক্তিগত অনুসারী ও সমর্থকদের উপস্থিতি এখনও দৃশ্যমান। বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অনুষ্ঠানে তার উপস্থিতি এবং অনুসারীদের তৎপরতা থেকে সেই প্রভাবের ইঙ্গিত পাওয়া যায় বলে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল মনে করে।

বর্তমান বাস্তবতায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো—এক সময় যিনি ছিলেন জাকির খানের অন্যতম বিশ্বস্ত সহকর্মী, সেই সাদেকই এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দু’জনই নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দা, দু’জনই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, কিন্তু তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, অনুসারী এবং কৌশল এখন সম্পূর্ণ আলাদা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির আগামী দিনের রাজনীতিতে এই দুই বলয়ের সম্পর্ক ও অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, সাংগঠনিক পদে থাকা সাদেকের হাতে রয়েছে জেলা যুবদলের আনুষ্ঠানিক নেতৃত্ব। অন্যদিকে, সাংগঠনিক পদ না থাকলেও দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ও অনুসারীদের কারণে জাকির খান এখনও একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক বাস্তবতা।

তবে জেলা যুবদলের আহ্বায়ক হিসেবে সাদেকুর রহমান সাদেক কতটা শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তুলতে পেরেছেন, জেলা যুবদলকে কতটা ঐক্যবদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং ভবিষ্যতে তিনি জেলা বিএনপির রাজনীতিতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। একইভাবে, দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর জাকির খান তার আগের রাজনৈতিক প্রভাব কতটা পুনরুদ্ধার করতে পারবেন, সেটিও এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম আলোচিত বিষয়।