শামীম ওসমানের বক্তব্যে নাশকতার আশংকা করছে সরকার...

“সতর্ক সরকার, সারা দেশে গোয়েন্দা নজরধারী ও গ্রেফতার অভিযান”

91

আমজাদ হোসেন :

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরকারের মধ্যে। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের একটি অংশকে মাঠে নামিয়ে দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হতে পারে—এমন আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সরকার।

দৈনিক আমার দেশের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে শামীম ওসমানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, তাঁর বক্তব্য এবং শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের দেশে ফেরার ঘোষণাকে ঘিরে সরকার সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা করছে। একই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এ বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারের কাছে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছে।

তবে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কথিত ওই তথ্যের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে সরকারের আশঙ্কার প্রকৃতি, সম্ভাব্য হুমকির মাত্রা কিংবা নির্দিষ্ট কোনো নাশকতার পরিকল্পনার বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপরও শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সরকারের উদ্বেগের কেন্দ্রে রয়েছে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য পুনর্গঠন

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়িত হোক বা না হোক, এ ধরনের ঘোষণা আওয়ামী লীগের তৃণমূলের একটি অংশকে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার রাজনৈতিক প্রেরণা দিতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় আত্মগোপনে থাকা কিংবা নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে যোগাযোগ ও সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা শুরু হলে তা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

সরকারের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন শেখ হাসিনা সত্যিই ডিসেম্বর মাসে দেশে ফিরবেন কি না, তা নয়; বরং তাঁর ফেরার ঘোষণা এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশের কোথাও সহিংসতা, নাশকতা বা জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না।

শেখ হাসিনার দেশে ফেরা কতটা বাস্তব?

শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে ব্যাপক প্রাণহানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে বাংলাদেশে বিচারিক প্রক্রিয়াও চলছে।

ফলে বর্তমান বাস্তবতায় শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে রাজনৈতিকভাবে তাঁকে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ, আন্দোলন-পরবর্তী জনমত এবং বিচারিক প্রক্রিয়া—সব মিলিয়ে দেশে তাঁর প্রত্যাবর্তন সহজ হবে না বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এ কারণে ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা থাকলেও বাস্তবে শেখ হাসিনা ওই সময় দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, ঘোষণাটি মূলত রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।

শামীম ওসমানের বক্তব্যেই কেন নজর?

সরকারের নজরে এখন বিশেষভাবে রয়েছেন শামীম ওসমান। নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী এই আওয়ামী লীগ নেতা ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি তাঁর বক্তব্যগুলোতে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সরকারের আশঙ্কা—শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা যদি আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে সক্রিয়তার বার্তা হিসেবে কাজ করে, তাহলে তার সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো মহল সহিংসতা বা নাশকতার পথ বেছে নিতে পারে।

এ কারণেই শামীম ওসমানের বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে না দেখে সম্ভাব্য আইনশৃঙ্খলা ঝুঁকির অংশ হিসেবেও মূল্যায়ন করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

আজ থেকেই কঠোর অভিযান?

এরই মধ্যে সারা দেশে সন্ত্রাস, নাশকতা ও অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। আজ থেকেই বিভিন্ন এলাকায় অভিযান শুরু হতে পারে বলে প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে এই অভিযান কতটা সন্ত্রাসবিরোধী এবং কতটা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কারণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নামে নিরপরাধ রাজনৈতিক কর্মী বা সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে।

রাজনীতির সামনে নতুন পরীক্ষা

শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা, শামীম ওসমানের বক্তব্য এবং সম্ভাব্য নাশকতার আশঙ্কা—এই তিনটি বিষয়কে ঘিরে আগামী কয়েক মাস দেশের রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি হতে পারে।

শেখ হাসিনা আদৌ ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন কি না, সেটি এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু তাঁর ফেরার ঘোষণা ইতোমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক মাঠে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। আর সেই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সহিংসতা বা নাশকতার চেষ্টা হলে সরকার যে কঠোর অবস্থানে যাবে, সাম্প্রতিক প্রশাসনিক তৎপরতা থেকে তারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

এখন মূল প্রশ্ন একটাই—ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন হবে, নাকি তাঁর ফেরার ঘোষণাকে ঘিরেই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন কোনো অধ্যায়ের সূচনা হবে?