নিজস্ব প্রতেবেদক :
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সীমানা সম্প্রসারণে ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর ইউনিয়নের পুরো এলাকা অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে জেলা প্রশাসন। গণশুনানি ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর জনসংখ্যা, পেশা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো ও জনমত বিবেচনায় এসব এলাকাকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার উপযোগী বলে মত দেওয়া হয়েছে।
তিন ইউনিয়ন নাসিকে যুক্ত হলে শুধু সিটি করপোরেশনের আয়তন ও জনসংখ্যাই বাড়বে না, বদলে যাবে আসন্ন নাসিক নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক সমীকরণও। বিশেষ করে মেয়র ও কাউন্সিলর নির্বাচন—দুই ক্ষেত্রেই নতুন যুক্ত হওয়া বিশাল ভোটার জনগোষ্ঠী গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
স্থানীয় পর্যায়ের একটি সাম্প্রতিক জরিপের দাবি, ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগরের মোট ভোটারের সংখ্যা প্রায় তিন লাখ। জরিপে অংশ নেওয়া ভোটারদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি বিএনপির প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। তবে এই জরিপের পদ্ধতি, নমুনার আকার ও ভোটারদের দলীয় পছন্দের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তারপরও স্থানীয় রাজনীতিতে এই হিসাবকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ফতুল্লা-কুতুবপুর-এনায়েতনগরকে নারায়ণগঞ্জের অন্যতম বড় রাজনৈতিক বলয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এসব এলাকার ভোটারদের একটি বড় অংশ যদি নির্বাচনের সময়ও বিএনপির দিকে থাকে, তাহলে নাসিক নির্বাচনে দলটির প্রার্থীদের জন্য তা গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।
তবে শুধু দলীয় সমর্থনের হিসাবেই নির্বাচনের ফল নির্ধারিত হবে না। নতুন করে যুক্ত হওয়া এলাকাগুলোতে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, স্থানীয় সাংগঠনিক শক্তি, ওয়ার্ডভিত্তিক ভোটের সমীকরণ এবং ভোটার উপস্থিতি—সবকিছুই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
বিশেষ করে কাউন্সিলর নির্বাচনে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। কারণ একটি বড় ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের একাধিক ওয়ার্ডে বিভক্ত হলে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থানীয় নেতাদের ব্যক্তিগত প্রভাব এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রাখবে। ফলে কোনো দলের সামগ্রিক সমর্থন বেশি থাকলেও প্রতিটি ওয়ার্ডে একই ধরনের ফল নাও হতে পারে।
মেয়র নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তিন ইউনিয়নের ভোট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। নতুন ভোটারদের পছন্দ যদি কোনো একটি দলের দিকে দৃশ্যমানভাবে বেশি থাকে, তাহলে মেয়র প্রার্থীদের প্রচারণায় এসব এলাকা বিশেষ গুরুত্ব পাবে। ফলে এতদিন নাসিকের প্রচলিত নির্বাচনী সমীকরণের বাইরে থাকা ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর এবার হয়ে উঠতে পারে নির্বাচনী রাজনীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র।
রাজনৈতিকভাবে বিএনপির জন্যও তাই নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। তবে স্থানীয় পর্যায়ের জরিপে ৬০ শতাংশের বেশি সমর্থনের দাবি থাকলেও সেটিকে সরাসরি নির্বাচনের ফলাফলের পূর্বাভাস হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ভোটের আগে প্রার্থী বাছাই, দলীয় ঐক্য, বিদ্রোহী প্রার্থী, প্রতিদ্বন্দ্বী দলের প্রার্থী এবং নির্বাচনী পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে ভোটের হিসাব দ্রুত বদলে যেতে পারে।
এদিকে জেলা প্রশাসনের সর্বশেষ সুপারিশ অনুযায়ী ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগরের পুরো অংশ নাসিকের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে। এর আগে জুলাইয়ের প্রাথমিক প্রস্তাবে বিভিন্ন ইউনিয়নের আংশিক এলাকা নিয়ে সীমানা সম্প্রসারণের কথা বলা হলেও পরবর্তী পরিদর্শন ও গণশুনানির পর তিন ইউনিয়নের সম্পূর্ণ অংশ অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
ফলে নাসিকের পরবর্তী নির্বাচন শুধু পুরোনো ২৭ ওয়ার্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—নতুন যুক্ত হতে যাওয়া এলাকার ভোটাররাও নির্বাচনী হিসাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠছেন। আর এই নতুন ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাবই এখন নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়।
শেষ পর্যন্ত কোন দলের প্রার্থীরা এসব ভোটকে নিজেদের পক্ষে নিতে পারবেন, তা নির্ভর করবে প্রার্থী বাছাই ও মাঠের সাংগঠনিক শক্তির ওপর। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যে স্পষ্ট—ফতুল্লা, কুতুবপুর ও এনায়েতনগর নাসিকে যুক্ত হলে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পুরোনো ভোটের হিসাব আর আগের মতো থাকবে না।




