নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে দুই জনপ্রিয় নেতার প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা কতোটুকু?...

পদ নেই, তবুও আলোচনায় জাকির-খোরশেদ

104

স্টাফ রিপোর্টার :

নারায়ণগঞ্জ শহরের রাজনীতিতে বিএনপির দুই পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ জাকির খান ও মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। দুজনেরই রয়েছে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচিতি, নিজস্ব কর্মী-সমর্থক এবং শহরের রাজনীতিতে আলাদা প্রভাব। অথচ একই দলের রাজনীতি করেও বর্তমানে দুজনের কারও হাতে নেই বিএনপির আনুষ্ঠানিক কোনো পদ।

রাজনৈতিক পদ না থাকলেও মাঠের রাজনীতিতে তাদের নিয়ে আলোচনা থেমে নেই। বরং সাম্প্রতিক বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তৎপরতা বলছে, নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে এখনো দুজনেরই আলাদা গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।

এর মধ্যে জাকির খানকে ঘিরে নতুন করে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশে ফেরেন তিনি। এরপর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলতি বছর আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একটি শোডাউনেও তাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে।

সম্প্রতি দেওভোগের একটি মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতি নিরসনে ভূমিকা রাখার পরও স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রশংসা হয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দীর্ঘ রাজনৈতিক অনুপস্থিতির পরও জাকির খানকে ঘিরে তরুণদের মধ্যে আগ্রহ কমেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার বক্তব্য, ছবি ও ভিডিও নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা যাচ্ছে। এমনকি ২০২৬ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েও তিনি আলোচনায় এসেছেন।

তবে জাকির খানের রাজনৈতিক পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। বিএনপি সরকারের আমলে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার কথা রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ছিল। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরও দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন তিনি। ফলে দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় সরাসরি রাজনীতির মাঠের বাইরে থেকেও তার জনপ্রিয়তা কতটা অটুট রয়েছে—এটি এখন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।

অন্যদিকে মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের রাজনৈতিক গল্পটি অনেকটা ভিন্ন। মহানগর যুবদলের সাবেক সভাপতি ও সাবেক কাউন্সিলর হিসেবে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে তার রয়েছে শক্তিশালী কর্মী-সমর্থক গোষ্ঠী এবং ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা।

কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকের মতে, খোরশেদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বড় ভাই অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো।

তৈমূর আলম খন্দকার একসময় বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন। কিন্তু বিএনপির সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী হওয়ায় তিনি দল থেকে বহিষ্কৃত হন। পরে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তৃণমূল বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব নেন।

এরপর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তৃণমূল বিএনপির হয়ে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় হন তৈমূর। ২০২৩ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়ায় এবং তৃণমূল বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের কারণে বিএনপির সঙ্গে তার রাজনৈতিক দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তৈমূরের এই রাজনৈতিক অবস্থানের প্রভাব পড়ে তার ছোট ভাই খোরশেদের ওপরও—এমন ধারণা রয়েছে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে। কারণ একই পরিবারের সদস্য হওয়ায় খোরশেদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও দলের ভেতরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়। ফলে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তিনি আগের অবস্থান ধরে রাখতে পারেননি।

এখানেই জাকির খান ও খোরশেদের রাজনৈতিক ভাগ্যের একটি অদ্ভুত মিল দেখা যায়। দুজনই বিএনপির পুরনো ও পরিচিত মুখ, দুজনেরই নিজস্ব কর্মী-সমর্থক রয়েছে, দুজনই শহরের রাজনীতিতে একসময় শক্তিশালী অবস্থানে ছিলেন—কিন্তু নানা রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুজনই এখন পদহীন।

তবে পদ না থাকা মানেই যে রাজনৈতিক প্রভাব শেষ হয়ে গেছে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তার উল্টো কথাই বলছে।

জাকির খানকে ঘিরে তরুণদের আগ্রহ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার সক্রিয় উপস্থিতি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে খোরশেদের ক্ষেত্রেও স্থানীয় পর্যায়ে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও পুরনো কর্মী-সমর্থকদের উপস্থিতি এখনো দৃশ্যমান।

এখন প্রশ্ন হলো—আগামী দিনে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে এই দুই নেতার জায়গা কোথায় হবে?

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে বিএনপির নতুন মেরুকরণ, সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস এবং আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতৃত্বের সমীকরণে তাদের কাউকে আবার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কারণ রাজনীতিতে পদ হারানো যায়, কিন্তু দীর্ঘদিনের তৈরি ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও কর্মী-সমর্থনের ভিত্তি একদিনে হারিয়ে যায় না। আর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে জাকির খান ও খোরশেদ—দুজনের ক্ষেত্রেই এই বাস্তবতাই যেন নতুন করে সামনে আসছে।