নাসিক এলাকায় বাড়ছে ডেঙ্গু

শহরজুড়ে এডিসের বিস্তার, নজরদারি ও মশক নিধন নিয়ে প্রশ্ন

65

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে ডেঙ্গু পরিস্থিতি। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ পরিসংখ্যানে চলতি বছর নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার ৬৬৩ জনে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের প্রথম কয়েক দিনেই আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৪ জন। বিভিন্ন হাসপাতালে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৪২ জন। পরিস্থিতির সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, জেলার আক্রান্তদের বড় একটি অংশ নারায়ণগঞ্জ সদর ও বন্দর এলাকার বাসিন্দা—অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বিস্তীর্ণ নগরাঞ্চলও ডেঙ্গুর উচ্চঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

৯ সেপ্টেম্বরের জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ওই ২৪ ঘণ্টায় নারায়ণগঞ্জে নতুন করে ৩৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। একই সময়ে ৩৫ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পান। চলতি বছরের আক্রান্তদের মধ্যে ১ হাজার ৫২১ জন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, শুধু আগস্ট মাসেই নারায়ণগঞ্জে ৭১০ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন। এর মধ্যে সদর উপজেলায় আক্রান্ত হন ২৫০ জন এবং বন্দরে ২৩৯ জন। জুলাই পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিল পাঁচ শতাধিক; আগস্টে সরকারি হাসপাতালেই ভর্তি রোগীর সংখ্যা সাত শতাধিক ছাড়িয়ে যায়।

আরও উদ্বেগের বিষয়, নাসিকের ২১ নম্বর ওয়ার্ডের সোনাকান্দা-চৌধুরীপাড়া এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আশা বেগম নামে এক গৃহবধূর মৃত্যুর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমে তাকে নারায়ণগঞ্জের খানপুর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

ফলে প্রশ্ন উঠেছে, নগরীর ২৭টি ওয়ার্ডে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে চলছে। বিশেষ করে বর্ষার পর নগরীর বিভিন্ন নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা, ড্রেন, নালা, ডাবের খোসা, প্লাস্টিকের পাত্র, টায়ার ও বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিতে এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে নিয়মিত নজরদারির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

শুধু ওষুধ ছিটিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়—জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের এই সতর্কবার্তা এবার আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এডিস মশা সাধারণত মানুষের বসতবাড়ি ও তার আশপাশের ছোট ছোট পানির আধারে বংশবিস্তার করে। ফলে নগর কর্তৃপক্ষের মশক নিধন কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত উৎসস্থল শনাক্ত ও ধ্বংস করার কার্যক্রম জরুরি।

সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় পর্যায়েও ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সরকার দেশব্যাপী পরিচ্ছন্নতা ও জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশ দিয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলও ডেঙ্গু প্রতিরোধে বাড়ির আঙিনা ও আশপাশ পরিষ্কার রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু নগরবাসীর প্রশ্ন, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব কোথায়? নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত এডিসের লার্ভা শনাক্তকরণ, প্রজননস্থল ধ্বংস, নালা-নর্দমা পরিষ্কার এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা না গেলে শুধু জনসচেতনতামূলক প্রচারণায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বলছে, নারায়ণগঞ্জে ডেঙ্গুর সংক্রমণ এখন আর বিচ্ছিন্ন কিছু এলাকার সমস্যা নয়। শহর ও উপজেলা—দুই পর্যায়েই আক্রান্ত বাড়ছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাশার জানিয়েছেন, ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট ও প্রয়োজনীয় উপকরণ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং সঠিক চিকিৎসায় অধিকাংশ রোগী দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠেন।

তবে রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনাতেও বাড়তি সতর্কতার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে ডেঙ্গু রোগীদের পক্ষ থেকে মশারি, বেডশিট, পরিচ্ছন্নতা, বিদ্যুৎ ও লিফট ব্যবস্থাপনা নিয়ে অভিযোগের কথাও উঠে এসেছে।

এদিকে দেশজুড়ে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্টরা সেপ্টেম্বর-অক্টোবরের পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নগর এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম এখনই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে পরিচালনা না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

নগরবাসীর দাবি, নাসিকের প্রতিটি ওয়ার্ডে জরুরি ভিত্তিতে বিশেষ ডেঙ্গু অভিযান পরিচালনা করা হোক। কোথায় এডিসের লার্ভা পাওয়া যাচ্ছে, কোন এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা বেশি, কোথায় নিয়মিত মশক নিধন হচ্ছে এবং কোথায় হচ্ছে না—এসব তথ্য প্রকাশ্যে এনে ওয়ার্ডভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আরও কার্যকর ফল পাওয়া সম্ভব।

ডেঙ্গুর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। স্বাস্থ্য বিভাগ রোগীদের চিকিৎসা দেবে, আর সিটি করপোরেশনকে রোগের উৎস—এডিস মশার প্রজননস্থল—ধ্বংস করতে হবে। নগরবাসীর সচেতনতা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা এবং নাসিকের কার্যকর মশক নিয়ন্ত্রণ অভিযান একসঙ্গে চললেই কেবল নারায়ণগঞ্জ নগরীকে ডেঙ্গুর বড় ধরনের বিস্তার থেকে রক্ষা করা সম্ভব।