৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার MRT-2: নারায়ণগঞ্জ শহর নয়, গন্তব্য রূপগঞ্জের তারাবো...

না.গঞ্জ শহরকে বাদ দিয়ে এমআরটি-২ লাইনের নতুন রোড ম্যাপ!

10

নিজস্ব প্রতিবেদক

ঢাকার গাবতলী থেকে পুরান ঢাকা হয়ে নারায়ণগঞ্জের দিকে নতুন মেট্রোরেল নির্মাণের উদ্যোগকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জবাসীর মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক আগ্রহ। তবে প্রস্তাবিত MRT Line-2-এর সর্বশেষ রুট ও প্রকল্প নথির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই মেট্রোরেল নারায়ণগঞ্জ শহর পর্যন্ত যাচ্ছে না। এর প্রস্তাবিত শেষ গন্তব্য নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জের তারাবো।

প্রায় ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা ব্যয়ের এই মেগা প্রকল্পের Preliminary Development Project Proposal (PDPP) ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশন যাচাই-বাছাই করেছে। এখন বৈদেশিক অর্থায়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রস্তাবটি অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ERD) পাঠানোর কথা জানিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। ফলে প্রকল্পটি এখনো অর্থায়ন ও পরবর্তী অনুমোদন প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের প্রধান কবির আহমেদ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া MRT Line-2-এর PDPP যাচাই-বাছাই শেষে বৈদেশিক অর্থায়নের জন্য ERD-তে পাঠানো হবে। অর্থাৎ, ‘নারায়ণগঞ্জে মেট্রোরেল’—এমন প্রচারণার বিপরীতে প্রকল্পটির বর্তমান অবস্থান এখনো চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যায়ে পৌঁছায়নি।

প্রস্তাবিত রুটের শুরু রাজধানীর গাবতলী থেকে। এরপর ঢাকা উদ্যান, বসিলা মোড়, মোহাম্মদপুর BRTC বাসস্ট্যান্ড, জিগাতলা, সায়েন্স ল্যাব, নিউমার্কেট, আজিমপুর, লালবাগ, চকবাজার, মিটফোর্ড, নয়াবাজার, ধোলাইখাল, দয়াগঞ্জ, কাপ্তানবাজার ও ডেমরা হয়ে রুটটি নারায়ণগঞ্জের তারাবোর দিকে যাওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি গুলিস্তান থেকে নয়াবাজার হয়ে সদরঘাট পর্যন্ত একটি শাখা লাইন নির্মাণের প্রস্তাবও রয়েছে।

এই তালিকা থেকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি স্পষ্ট হয়—প্রস্তাবিত মূল রুটে নারায়ণগঞ্জ শহর, চাষাঢ়া, নিতাইগঞ্জ, খানপুর, ফতুল্লা কিংবা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কেন্দ্রীয় কোনো এলাকা নেই। রুটের শেষ প্রান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে রূপগঞ্জের তারাবোকে।

অর্থাৎ, ‘নারায়ণগঞ্জের মেট্রোরেল’ বলা হলেও বর্তমান প্রকল্পের সরাসরি সুবিধা নারায়ণগঞ্জ শহরের বাসিন্দারা কোথা থেকে পাবেন—এ প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকল্পের প্রকাশিত রুটে নেই।

প্রকল্পের সর্বশেষ BSS প্রতিবেদনে MRT Line-2-এর রেলপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার এবং স্টেশন ২৪টি বলা হয়েছে। এর একটি অংশ উড়ালপথে এবং অন্য অংশ পাতালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ২৮-৩০ আগস্ট প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনে রুটের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ কিলোমিটার বলা হয়েছে। ফলে চূড়ান্ত DPP অনুমোদনের আগে রুটের মোট দৈর্ঘ্য নিয়ে স্পষ্ট সরকারি নথি প্রকাশ হওয়া প্রয়োজন।

প্রকল্পটির আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। এর বড় অংশ বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে। সরকার বিশ্বব্যাংকের কাছে প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ সহায়তা চেয়েছে। একই সঙ্গে এশীয় অবকাঠামো বিনিয়োগ ব্যাংক—AIIB-এর সঙ্গেও অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা চলছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের শুরুতে নির্মাণকাজ শুরু করার এবং ২০৩০ সালের মধ্যে MRT Line-2 চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড—DMTCL। তবে বিদেশি অর্থায়ন, চূড়ান্ত অনুমোদন, বিস্তারিত নকশা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই সময়সূচিকে চূড়ান্ত বাস্তবায়ন সময়সীমা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

পুরান ঢাকাকে প্রথমবারের মতো সরাসরি মেট্রোরেল নেটওয়ার্কে যুক্ত করা এই প্রকল্পের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। গাবতলী থেকে পুরান ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো পেরিয়ে ডেমরা হয়ে তারাবো পর্যন্ত সংযোগ তৈরি হলে রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থায় এর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন মেট্রোরেল লাইনের সঙ্গে সংযোগের মাধ্যমে বৃহত্তর ঢাকার গণপরিবহন নেটওয়ার্ক আরও সমন্বিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

তবে নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা দিয়ে রুট গেলেও নারায়ণগঞ্জ শহরকে মূল মেট্রোরেল রুটের বাইরে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ থেকে মুন্সীগঞ্জ পর্যন্ত রুট সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা সর্বশেষ সরকারি সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই সম্প্রসারণ বর্তমান MRT Line-2 প্রকল্পের অংশ নয়; এটি ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

ফলে ৬০ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকার প্রকল্পকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জবাসীর সামনে এখন দুটি আলাদা বিষয়কে পৃথক করে দেখা জরুরি—একটি হলো বর্তমান MRT Line-2, যার প্রস্তাবিত গন্তব্য তারাবো; অন্যটি হলো ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ শহর ও মুন্সীগঞ্জের দিকে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা।

নারায়ণগঞ্জবাসীর জন্য এখানেই মূল প্রশ্ন: ৬০ হাজার কোটি টাকার মেট্রোরেল প্রকল্পের নাম যদি হয় নারায়ণগঞ্জমুখী MRT Line-2, তাহলে নারায়ণগঞ্জ শহরের লাখো মানুষের সরাসরি মেট্রো সুবিধা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা কোথায়?

বর্তমান প্রস্তাবিত রুটের উত্তর—শহরের ভেতর নয়, রূপগঞ্জের তারাবো।

আর তাই MRT Line-2 নিয়ে ‘নারায়ণগঞ্জে মেট্রোরেল আসছে’—এই সরল প্রচারণার পাশাপাশি প্রকল্পের প্রকৃত রুট, স্টেশন, অর্থায়ন ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও জনগণের সামনে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন।

কারণ মেট্রোরেল নারায়ণগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করছে—এটি এক বাস্তবতা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ শহর মেট্রোরেলের সরাসরি আওতায় আসছে—বর্তমান প্রকল্পের নথি সেই কথা বলছে না।