প্রায় এক সপ্তাহ পরে গতকাল নারায়ণগঞ্জের কোনো কোনো এলাকায় গ্যাস এসেছে। নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় রান্না ঘরে চুলা জ¦লার খবর পাওয়া গেছে। কিন্তু গতকাল সন্থ্যায় এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ফতুল্লার বহু এলাকায় রান্না ঘরে চুলা জ¦লেনি।
এদিকে গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই অথচ মানুষের হাতে বিল আছে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সামনে উৎপাদনের টার্গেট আছে, ব্যবসায়ীদের ঋণের কিস্তি আছে এবং সরকারের সামনে আছে অর্থনীতি সচল রাখার কঠিন দায়িত্ব। এই বাস্তবতায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে আর ‘সাময়িক সমস্যা’ বলে পাশ কাটানোর সুযোগ নেই। এটি এখন সরাসরি জনজীবন, অর্থনীতি এবং সরকারের গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন। এই সংকটের সমাধান না হলে অতীতের মতোই এই সরকারকে করুন পরিনতি বরন করতে হতে পারে। অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে বিদ্যুৎ সংকটের কারনে কানসাট ট্রাজেডি এবং ডেমরায় দৌড় সালাউদ্দিনের কথা আজও ভুলে যায়নি মানুষ।
সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময়ের লোডশেডিং মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করছে। কোথাও কোথাও ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার খবরও এসেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো গ্যাসের সংকট শুধু চুলায় আগুন জ্বালাতে সমস্যা করছে না, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, কর্মসংস্থান এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই সংকটের দায় সরকার এড়াবে কীভাবে?
সরকার বলতে শুধু বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বোঝায় না। সরকার মানে একটি সমন্বিত প্রশাসনিক ব্যবস্থা। জনগণ যখন একটি সরকারকে দায়িত্ব দেয়, তখন তারা শুধু রাস্তা-ঘাট বা আইনশৃঙ্খলা নয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি, খাদ্য, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তাও প্রত্যাশা করে।
তাই গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে এবং তার প্রভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হলে জনগণ স্বাভাবিকভাবেই সরকারের দিকে তাকাবে। আর এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। কারণ বিদ্যুৎ-গ্যাস এমন দুটি সেবা, যার সংকট মানুষের ঘরের দরজায় সরাসরি আঘাত করে। একজন ব্যবসায়ী হয়তো সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা করবেন না, কিন্তু দিনের পর দিন বিদ্যুৎ না থাকলে তার ব্যবসা বন্ধ হবে। একজন শিল্পমালিক রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন না, কিন্তু গ্যাসের চাপ না থাকলে উৎপাদন বন্ধ করে শ্রমিক ছাঁটাই করতে বাধ্য হতে পারেন। একজন সাধারণ মানুষ রাজনীতি নিয়ে মাথা না ঘামালেও রান্নার চুলায় আগুন না জ্বললে তার ক্ষোভ তৈরি হবেই। অর্থাৎ, জ্বালানি সংকট খুব দ্রুত রাজনৈতিক অসন্তোষে পরিণত হতে পারে।
ইতোমধ্যেই গ্যাসের স্বল্পতার কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর আসছে। কোনো কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্ধারিত গ্যাসচাপের তুলনায় অত্যন্ত কম চাপ পাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ক্ষতির মুখে পড়ছে। কোথাও কোথাও গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন লাইন বন্ধ কিংবা ছুটি বাড়ানোর ঘটনাও ঘটছে।
এর অর্থ খুব পরিষ্কার আজ গ্যাস নেই, কাল উৎপাদন কমবে, উৎপাদন কমলে কর্মসংস্থান ও রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে; রপ্তানি ও বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হলে অর্থনীতিতে চাপ বাড়বে, আর অর্থনীতিতে চাপ বাড়লে তার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়েই পড়বে।
আরেকটি বিষয় সরকারকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে শুধু বিদেশ থেকে এনে সংকট সামাল দেওয়ার নীতি কতটা টেকসই? আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। আমদানি নির্ভরতার এই কাঠামো দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে।
এখানে সরকারের কাছে জনগণের একটি মৌলিক প্রশ্ন থাকা উচিত দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কোথায়? শুধু সংকট দেখা দিলে কেনা, সংকট বাড়লে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশ দেওয়া এবং পরিস্থিতি খারাপ হলে জনগণকে আরও কিছুটা কষ্ট সহ্য করার আহ্বান জানানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি হতে পারে না।
বিদ্যুৎ সাশ্রয় অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সাশ্রয়ের বোঝা কি সবসময় জনগণের ওপরই পড়বে? দোকানপাট দ্রুত বন্ধ করতে বলা হচ্ছে, বিদ্যুৎ ব্যবহারে নানা বিধিনিষেধ আসছে। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারকে বলতে হবে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কোথায় ভুল হয়েছে, কোথায় অপচয় হয়েছে, কোথায় পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল এবং ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কারণ জনগণ শুধু বিদ্যুৎ চায় না, জনগণ একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যাও চায়। সবচেয়ে বড় বিপদ হবে যদি সরকার মনে করে, কয়েকদিন পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেলেই সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।
না, বিষয়টি এত সহজ নয়। একবার যদি শিল্পোদ্যোক্তারা মনে করেন বাংলাদেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি পাওয়া যায় না, তাহলে নতুন বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত বদলে যেতে পারে। একবার যদি সাধারণ মানুষ মনে করেন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল নিয়মিত দিতে হবে, কিন্তু সেবা নিয়মিত পাওয়া যাবে না তাহলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হবে।
আর আস্থার সংকট কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করে রাতারাতি সমাধান করা যায় না। সরকারের উচিত এখনই জরুরি ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলা করা। বিশেষ করে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও উৎপাদনমুখী শিল্পে সরবরাহের বাস্তব পরিস্থিতি জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদনে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। শুধু আমদানিনির্ভর সমাধান দিয়ে জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
এর পাশাপাশি জ্বালানি খাতের ব্যর্থতার দায়ও নির্ধারণ করতে হবে। কোথায় প্রশাসনিক দুর্বলতা, কোথায় পরিকল্পনার ঘাটতি, কোথায় আর্থিক সমস্যা এবং কোথায় ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা এসব নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়ন প্রয়োজন। জনগণের কষ্টকে শুধু ‘বিশ্ব পরিস্থিতির প্রভাব’ বলে ব্যাখ্যা করলে সরকারের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আন্তর্জাতিক সংকট বাস্তব কিন্তু সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাই একটি সরকারের দক্ষতার প্রধান পরীক্ষা।
আজ গ্যাসের সংকট, তার পরিণতিতে বিদ্যুৎ সংকট। আগামীকাল যদি এটি শিল্প ও কর্মসংস্থানের সংকটে রূপ নেয়, তখন পরিস্থিতি সামলানো আরও কঠিন হবে। সরকারের জন্য তাই সতর্কবার্তাটি পরিষ্কার গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটকে আর নিছক প্রশাসনিক সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না, এটিকে জাতীয় অর্থনীতি ও জনআস্থার সংকট হিসেবে দেখতে হবে।
কারণ বিদ্যুৎ চলে গেলে অন্ধকার নামে ঘরে। গ্যাস না থাকলে আগুন জ্বলে না চুলায়। কিন্তু দীর্ঘদিন জ্বালানি সংকট চললে অন্ধকার নামতে পারে অর্থনীতিতে, আর ক্ষোভ জমতে পারে মানুষের মনে।
সেই ক্ষোভের রাজনৈতিক মূল্য শেষ পর্যন্ত সরকারকেই দিতে হয়। ##
গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট




