নিজস্ব প্রতিবেদক :
পানগাঁওয়ের অব্যবহৃত সক্ষমতার অভিজ্ঞতার পরও জনবহুল নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্রে নতুন টার্মিনাল, ভারী যান চলাচলের সড়ক কোথায়—প্রশ্ন নগরবাসীর
নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রাণকেন্দ্র খানপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর তীরে প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ও বাল্ক টার্মিনালকে ঘিরে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ। সরকারের পরিকল্পনায় নদীপথে কনটেইনার ও পণ্য পরিবহন বাড়িয়ে সড়কের ওপর চাপ কমানোর কথা বলা হলেও নগরবাসীর প্রশ্ন, নদীপথে পণ্য এনে শেষ পর্যন্ত সেই পণ্য শহরের ভেতরের সড়ক দিয়েই যদি পরিবহন করতে হয়, তাহলে সড়কের ওপর চাপ কমবে কোথায়?
আরও বড় প্রশ্ন, জনবহুল নারায়ণগঞ্জ শহরের এমন একটি এলাকায় এই টার্মিনাল নির্মাণ করা হচ্ছে কেন, যেখানে ভারী কনটেইনারবাহী ট্রেইলার ও কাভার্ড ভ্যান চলাচলের জন্য পৃথক কোনো সুস্পষ্ট নগর-বাইপাস বা সরাসরি সংযোগ সড়কের পরিকল্পনা দৃশ্যমান নয়?
এই প্রশ্ন এখন আর শুধু নাগরিকদের মুখের কথা নয়। ২০২৬ সালে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দিয়ে খানপুরের কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ বন্ধ অথবা অন্যত্র স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, টার্মিনালটি চালু হলে চাষাঢ়াসহ শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়গুলোতে ভারী যানবাহনের চাপ বাড়বে এবং নগরজীবন আরও বিপর্যস্ত হতে পারে।
সাম্প্রতিক ১৯ সেপ্টেম্বরের নাগরিক অধিকার ফোরামের প্রতিনিধি সম্মেলনেও খানপুরের টার্মিনাল অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার দাবি উঠেছে। নাগরিক নেতারা অভিযোগ করেছেন, জনবহুল শহরের ভেতরে এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শহরের যানজট ও জনদুর্ভোগ আরও বাড়বে।
কিন্তু নাগরিকদের এই আশঙ্কার বিপরীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রকল্পটির পরিকল্পনা করার সময় ভবিষ্যৎ ট্রাফিকের ওপর এর প্রভাব কতটা বিশদভাবে বিবেচনা করা হয়েছে?
প্রকল্পের সরকারি নাম ‘নারায়ণগঞ্জের খানপুরে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার এবং বাল্ক টার্মিনাল নির্মাণ’। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (BIWTA) মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৩৯২ কোটি টাকা। প্রথম সংশোধনের পর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫৭ শতাংশ। সরকারি প্রকল্প তালিকায় এর বাস্তবায়নকাল জানুয়ারি ২০২০ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।
প্রকল্পটির আওতায় শুধু কনটেইনার রাখার জায়গা তৈরি হচ্ছে না। নির্মাণ করা হচ্ছে কনটেইনার ইয়ার্ড, মাল্টিপারপাস জেটি, বাল্ক কার্গোর জন্য বিভিন্ন স্থাপনা, গুদাম, কনটেইনার ফ্রেইট স্টেশন, প্রশাসনিক ভবনসহ নানা অবকাঠামো। অর্থাৎ এটি চালু হলে খানপুরে বড় ধরনের বাণিজ্যিক কার্গো কার্যক্রম গড়ে উঠবে।
সরকারের যুক্তি হচ্ছে, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাসহ আশপাশের শিল্পাঞ্চলে কনটেইনার নদীপথে পরিবহন করা গেলে সড়কপথের ওপর চাপ কমবে। নারায়ণগঞ্জ বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল হওয়ায় নদীপথের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি হলে ব্যবসা-বাণিজ্যে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কাগজে-কলমে যুক্তিটি শক্তিশালী। কিন্তু বাস্তবতার জায়গায় এসে প্রশ্নটি আরও কঠিন।
কনটেইনার নদীপথে খানপুরে পৌঁছানোর পর সেটি তো নদীতে পড়ে থাকবে না। সেটিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে হবে। সেই গন্তব্য হতে পারে নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, নরসিংদী কিংবা দেশের অন্য কোনো শিল্পাঞ্চল। আর এসব গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য বড় একটি অংশকে শেষ পর্যন্ত সড়কপথ ব্যবহার করতেই হবে।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, নদীপথে পণ্য এনে সড়কের ওপর চাপ কমানোর যে লক্ষ্য সামনে রাখা হয়েছে, খানপুরের ক্ষেত্রে সেই পণ্য শহর থেকে বের করার জন্য কোন সড়ক ব্যবহার করা হবে?
এই প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ স্পষ্ট না হচ্ছে, ততক্ষণ প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা থেকেই যাচ্ছে—টার্মিনালের সঙ্গে নগর সড়কব্যবস্থার সংযোগ।
স্থানীয় পর্যায়ে প্রকাশিত বিশ্লেষণেও এই বিষয়টিকে প্রকল্পটির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খানপুর, চাষাঢ়া, মিশনপাড়া ও আশপাশের সড়কগুলোতে অতিরিক্ত ভারী যান চলাচল হলে নগরের বিদ্যমান যানজট আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বিশেষ করে চাষাঢ়া মোড়কে ঘিরে সম্ভাব্য চাপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ শহরের বাস্তবতা হলো, এখানে এমনিতেই সড়কের তুলনায় যানবাহনের চাপ বেশি। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে প্রতিদিন যাত্রীবাহী বাস, সিএনজি, অটোরিকশা, রিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল করে। এর মধ্যে বিভিন্ন স্থানে অবৈধ পার্কিং ও স্ট্যান্ডের কারণে সড়কের কার্যকর প্রস্থও কমে যায়।
এই বাস্তবতায় কনটেইনারবাহী ভারী ট্রেইলার যুক্ত হলে তার প্রভাব শুধু খানপুরে সীমাবদ্ধ থাকবে না। শহরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থলগুলোতে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আর এখানেই সামনে আসে পানগাঁওয়ের অভিজ্ঞতা।
২০১৩ সালে কেরানীগঞ্জের বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল চালু করা হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় কনটেইনার পরিবহনে নদীপথের ব্যবহার বাড়ানো এবং সড়কের ওপর চাপ কমানো। টার্মিনালটির বার্ষিক কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার TEU।
কিন্তু এক দশকের বেশি সময় পরও টার্মিনালটি সেই সক্ষমতার কাছাকাছি যেতে পারেনি।
২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, পানগাঁওয়ের সক্ষমতার প্রায় ৯৯ শতাংশই অব্যবহৃত ছিল। এক বছরে সেখানে মাত্র ১ হাজার ২৪৭ একক কনটেইনার ওঠানামা করার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় কনটেইনার পরিবহনে নৌপথে খরচ সড়ক ও রেলপথের তুলনায় বেশি হওয়ায় ব্যবসায়ীরা পানগাঁও ব্যবহার করতে আগ্রহী নন।
আরেকটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পানগাঁওয়ের সমস্যা আরও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়, টার্মিনালের ৫৫ হাজার বর্গমিটার কনটেইনার ইয়ার্ডের মাত্র ৩ থেকে ৪ শতাংশ জায়গা ব্যবহৃত হচ্ছিল এবং ১৮০ মিটার দীর্ঘ জেটিও অনেকটা ফাঁকা পড়ে ছিল।
অর্থাৎ অবকাঠামো আছে, সক্ষমতা আছে, জেটি আছে—কিন্তু ব্যবহারকারী নেই।
কেন?
ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সময় ও খরচ—দুই দিক থেকেই পানগাঁও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিল। নিয়মিত জাহাজ না চলায় রপ্তানি পণ্য পাঠাতে অপেক্ষা করতে হয়। পণ্য খালাসেও সময় লাগে। এসব কারণে ব্যবসায়ীরা সড়কপথকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক মনে করেন।
২০২৫ সালের আরেক প্রতিবেদনে বলা হয়, চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁও হয়ে পণ্য পরিবহনে প্রতি TEU-তে অতিরিক্ত ৮০০ থেকে ১ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত ব্যয়ের অভিযোগ রয়েছে। সেই প্রতিবেদনে পানগাঁওয়ের ব্যবহার কখনো কখনো সক্ষমতার মাত্র ৫ শতাংশে নেমে যাওয়ার কথাও উল্লেখ করা হয়।
তবে পানগাঁওয়ের গল্প এখানেই শেষ নয়। ২০২৫ সালের শেষদিকে পানগাঁও টার্মিনাল নতুন ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে নতুন ব্যবস্থাপনায় কার্যক্রম পুনরায় শুরু করার কথা সরকারি তথ্যবিবরণীতে জানানো হয়। অর্থাৎ পানগাঁওকে পুরোপুরি মৃত প্রকল্প বলার সুযোগ নেই; বরং এর দীর্ঘদিনের কম ব্যবহার ও অপারেশনাল সমস্যাগুলো থেকে এখন নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলছে।
এখানেই খানপুর প্রকল্পের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষাটি লুকিয়ে আছে।
পানগাঁওয়ের সমস্যা ছিল টার্মিনালের ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারা। খানপুরের সম্ভাব্য সমস্যা হতে পারে তার উল্টো—টার্মিনাল যদি সফলভাবে পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হয়, তাহলে সেই বিপুল কার্গো শহরের কোন রাস্তা দিয়ে বের হবে?
অর্থাৎ পানগাঁও আমাদের একটি প্রশ্ন দিয়েছে—টার্মিনাল তৈরি করলেই কি ব্যবসায়ী ব্যবহার করবেন?
আর খানপুরের প্রশ্ন—ব্যবসায়ী ব্যবহার করলে শহর কি সেই চাপ নিতে পারবে?
দুটিই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
খানপুর প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও এই আলোচনার বাইরে রাখা যায় না। ৩৯২ কোটি টাকা থেকে প্রকল্প ব্যয় ৬১৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে নকশা পরিবর্তন, জেটির ভার বহনক্ষমতা বাড়ানো, মাটির অবস্থার কারণে ভিত্তি নির্মাণের ব্যয় বৃদ্ধি, নদীতীর সংরক্ষণ এবং অতিরিক্ত অবকাঠামো যুক্ত করার মতো কারণ দেখানো হয়েছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় ৬১৬ কোটি টাকা বিনিয়োগের এই টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে নারায়ণগঞ্জ শহরের ওপর কী পরিমাণ অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ পড়বে—এর সুনির্দিষ্ট হিসাব কোথায়?
প্রতিদিন সম্ভাব্য কতটি কনটেইনারবাহী ট্রেইলার টার্মিনালে ঢুকবে?
কতটি বের হবে?
এসব ট্রেইলার কোন সড়ক দিয়ে শহর ছাড়বে?
চাষাঢ়া কি এই চাপ নেবে?
শহরের হাসপাতাল, স্কুল, আবাসিক এলাকা ও ব্যবসাকেন্দ্রগুলোর ওপর এর প্রভাব কী হবে?
ভারী যান চলাচলের কারণে সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কত বাড়বে?
এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—টার্মিনাল থেকে জাতীয় মহাসড়ক বা শিল্পাঞ্চলে যাওয়ার জন্য শহরের ভেতর দিয়ে না গিয়ে সরাসরি কোনো বিকল্প করিডোর কি তৈরি করা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর ছাড়া শুধু ‘নদীপথে পণ্য পরিবহন বাড়বে’—এই যুক্তি দিয়ে প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন করা কঠিন।
কারণ নদীপথে একটি কনটেইনার পরিবহন করলে সড়কের ওপর চাপ কমবে—এটি তাত্ত্বিকভাবে সত্য। কিন্তু সেই কনটেইনার যদি নদীর ঘাট থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য আবার শহরের ভেতরের রাস্তায় ভারী ট্রেইলারে ওঠে, তাহলে চাপের ধরন বদলাবে মাত্র; পুরোপুরি দূর হবে না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবেশ।
শীতলক্ষ্যা দীর্ঘদিন ধরে শিল্পদূষণের সঙ্গে লড়াই করছে। এর মধ্যে নতুন একটি বড় কার্গো টার্মিনাল চালু হলে নদীতে বার্জ ও কার্গো জাহাজের চলাচল বাড়বে। পণ্য ওঠানামা, তেল-গ্রিজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেজিং এবং নদীতীর ব্যবহারের ফলে পরিবেশগত চাপ কতটা বাড়বে, তার পূর্ণাঙ্গ হিসাবও জনসমক্ষে থাকা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে শহরের ভেতরে ভারী যান চলাচল বাড়লে বায়ু ও শব্দদূষণের সম্ভাব্য প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। নাগরিকদের অভিযোগ বা আশঙ্কাকে বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে যাচাই করাই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
খানপুরের নাগরিকদের বিরোধিতার মূল জায়গাটিও এখানেই।
তারা বলছেন, নদীপথের উন্নয়ন তারা চান, কিন্তু শহরের হৃদপিণ্ডে কনটেইনার টার্মিনাল চান না। ২০২৬ সালে একাধিক নাগরিক সংগঠন প্রশাসনের কাছে প্রকল্পটি বন্ধ বা অন্যত্র স্থানান্তরের দাবি জানিয়েছে। মে মাসে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক আন্দোলন জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়।
সেপ্টেম্বরেও নাগরিক অধিকার ফোরামের সম্মেলনে একই দাবি পুনর্ব্যক্ত হয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্পের পক্ষে যুক্তি হলো, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য নদীপথে সরাসরি কনটেইনার পরিবহনের সুযোগ তৈরি হলে দেশের লজিস্টিক ব্যয় ও সড়কনির্ভরতা কমতে পারে। খানপুর নদীপথের সঙ্গে ভালোভাবে সংযুক্ত হওয়ায় এ স্থানকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখার কথাও বিভিন্ন প্রকল্প-সংক্রান্ত বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
অর্থাৎ বিরোধটি আসলে ‘উন্নয়ন বনাম উন্নয়নবিরোধিতা’র নয়।
বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে উন্নয়নের স্থান নির্বাচন, পরিবহন অবকাঠামো এবং নগর পরিকল্পনা।
একটি শহরের কেন্দ্রস্থলে এমন প্রকল্প স্থাপনের আগে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হওয়া উচিত ছিল সমন্বিত নগর ও পরিবহন পরিকল্পনা। টার্মিনাল কোথায় হবে, তার সঙ্গে সড়ক কোথায় হবে, ট্রেইলার কোন পথে যাবে, কোথায় পার্কিং হবে, কখন ভারী যান চলবে, কীভাবে শহরের ভেতরে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা হবে—এসব বিষয় একই পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
নইলে নদীতে একটি আধুনিক টার্মিনাল তৈরি হলেও তার পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা যদি শহরের রাস্তায় এসে আটকে যায়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।
আর এখানেই পানগাঁওয়ের অভিজ্ঞতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
পানগাঁও দেখিয়েছে, অবকাঠামো নির্মাণের পর ব্যবহার নিশ্চিত করা কত কঠিন। খানপুরকে এখন দেখাতে হবে, অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি শহরের ওপর তার প্রভাব কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
কারণ খানপুরের ক্ষেত্রে ঝুঁকি দুই দিকের।
টার্মিনাল সফল না হলে বিপুল বিনিয়োগের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
আর টার্মিনাল সফল হলে, পূর্ণ সক্ষমতায় পণ্য পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক ও নগর অবকাঠামো প্রস্তুত না থাকলে নারায়ণগঞ্জ শহরকে দিতে হতে পারে অন্য ধরনের মূল্য।
তাই এখনই কয়েকটি তথ্য প্রকাশের দাবি উঠতে পারে—প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ট্রাফিক ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, সম্ভাব্য দৈনিক কনটেইনার ট্রাকের সংখ্যা, নির্ধারিত ট্রাক রুট, শহরের বাইরে সরাসরি সংযোগ সড়কের পরিকল্পনা, পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন এবং পানগাঁওয়ের সঙ্গে তুলনামূলক অর্থনৈতিক feasibility analysis।
এই তথ্যগুলো প্রকাশ করা হলে বিতর্ক অনেকটাই পরিষ্কার হবে।
কারণ নারায়ণগঞ্জবাসী শুধু জানতে চাইছে না, ‘পোর্ট হবে কি হবে না’।
তারা জানতে চাইছে, ৬১৬ কোটি টাকা খরচ করে যে পোর্ট তৈরি হচ্ছে, সেটি চালু হওয়ার পর তাদের শহরের ভবিষ্যৎ কী হবে।
যে প্রকল্পের উদ্দেশ্য সড়কের ওপর চাপ কমানো, সেটিই যদি শহরের রাস্তায় নতুন চাপ তৈরি করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—পরিকল্পনায় কোথাও কি নদীকে দেখা হয়েছে, কিন্তু শহরকে দেখা হয়নি?
খানপুর কনটেইনার টার্মিনালের প্রকৃত পরীক্ষা তাই নির্মাণ শেষ হওয়ার দিন নয়।
প্রকৃত পরীক্ষা হবে যেদিন প্রথম বড় আকারে কনটেইনারবাহী ট্রেইলার টার্মিনাল থেকে বের হয়ে নারায়ণগঞ্জ শহরের সড়কে উঠবে।
সেদিন বোঝা যাবে—এটি শুধু একটি বন্দর হয়েছে, নাকি একটি পূর্ণাঙ্গ নদী-সড়ক-নগর পরিবহন ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
আর সেই উত্তরই নির্ধারণ করবে ৬১৬ কোটি টাকার খানপুর প্রকল্প নারায়ণগঞ্জের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনবে, আর কতটা নতুন সংকট তৈরি করবে।




