নারায়ণগঞ্জেও ঘটতে পারে অপ্রিতিমের মতো ঘটনা

গডফাদার বদলায় কিশোর গ্যাং থাকে!

108

রফিকুল ইসলাম জীবন :

একটি শিশুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আবারও সামনে নিয়ে এসেছে পুরোনো এক ভয়ংকর বাস্তবতা—নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাং কি কখনো সত্যিই বিলুপ্ত হয়? নাকি শুধু বদলে যায় তাদের পেছনের আশ্রয়দাতা?

কিশোর গ্যাংয়ের হাতে শিশু অপ্রিতিম হত্যাকাণ্ডের পর এই প্রশ্ন এখন শুধু একটি পরিবারের কান্নার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রশ্ন উঠেছে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং সর্বোপরি এসব কিশোর অপরাধী গ্রুপের পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে।

কারণ নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাং কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাম্প্রতিক ঘটনা নয়। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বছরের পর বছর ধরে নানা নামে কিশোর ও তরুণদের অপরাধী গ্রুপের তৎপরতার অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারায়ণগঞ্জে ছোট-বড় শতাধিক কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। গত পাঁচ বছরে এসব গ্যাংয়ের সহিংসতায় অন্তত ১৩ জন নিহত হওয়ার তথ্যও ওই প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

ফতুল্লা থেকে সিদ্ধিরগঞ্জ, বন্দর থেকে সোনারগাঁ, রূপগঞ্জ থেকে আড়াইহাজার—বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে এসব গ্রুপের অস্তিত্বের কথা স্থানীয় সূত্রে উঠে এসেছে। কারও হাতে ছুরি, কারও হাতে চাপাতি; কোথাও মাদক, কোথাও ছিনতাই, কোথাও আধিপত্য বিস্তার। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হামলা থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়ানোর ঘটনাও ঘটছে।

কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই কিশোররা এতটা বেপরোয়া হওয়ার সাহস পায় কোথা থেকে?

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, এসব গ্রুপের একটি অংশের পেছনে রয়েছে এলাকার প্রভাবশালী ‘বড় ভাই’দের ছত্রচ্ছায়া। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা স্থানীয় ক্ষমতার কারণে অপরাধে জড়িয়েও কেউ কেউ সহজে পার পেয়ে যায়—এমন অভিযোগও রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জে এই অভিযোগের রাজনৈতিক ইতিহাসও দীর্ঘ।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলার কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও জনপ্রতিনিধিকে ঘিরে বিভিন্ন অপরাধীচক্র, ক্যাডার ও কিশোরদের রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার বা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ নানা সময়ে আলোচনায় এসেছে। সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, নজরুল ইসলাম বাবু, গোলাম দস্তগীর গাজী এবং আবদুল্লাহ আল কায়সারকে ঘিরে বিভিন্ন মামলার এজাহার ও রাজনৈতিক অভিযোগ সামনে এসেছে। তবে এসব মামলায় নাম থাকা বা অভিযোগ ওঠা মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়—এই আইনি পার্থক্যটিও গুরুত্বপূর্ণ।

অর্থাৎ প্রশ্নটি শুধু কে গডফাদার ছিলেন—তা নয়। প্রশ্ন হলো, সেই সময়ে তৈরি হওয়া অপরাধী নেটওয়ার্কগুলোর কী হলো?

জুলাই-আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কি সেগুলো ভেঙে গেছে?

নাকি পুরোনো গ্রুপগুলোই নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন আশ্রয় খুঁজে নিয়েছে?

নারায়ণগঞ্জের সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বলছে, অন্তত কিশোর অপরাধের সমস্যাটি শেষ হয়ে যায়নি।

গত আগস্টে বন্দরে ইসলামী যুব আন্দোলনের নেতা বুলবুল আহমেদ হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় একটি কিশোর অপরাধী দলের সদস্যদের জড়িত থাকার কথা পুলিশ জানিয়েছে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরোনো বিরোধের জেরে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটে এবং অভিযুক্তদের একজন স্থানীয় কিশোর অপরাধী দলের নেতৃত্ব দিতেন বলে পুলিশ ও স্থানীয়দের বক্তব্যে এসেছে।

এই ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখিয়ে দেয়, রাজনৈতিক পালাবদল হলেও অপরাধী নেটওয়ার্কের সামাজিক অস্তিত্ব রাতারাতি শেষ হয়ে যায় না।

বরং প্রশ্ন উঠছে—নারায়ণগঞ্জে কি গডফাদার বদলায়, কিন্তু গ্যাং থেকে যায়?

অভিযোগ রয়েছে, একসময় যারা আওয়ামী লীগের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত, তাদের একটি অংশ এখন নতুন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছে। বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতার বিরুদ্ধে এমন কিশোর ও তরুণদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও উঠছে। তবে এই অভিযোগের ব্যাপকতা বা নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত করতে স্বাধীন তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।

এখানেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি সামনে আসে।

যদি কিশোর গ্যাংয়ের পৃষ্ঠপোষকতা সত্যিই রাজনৈতিক হয়, তাহলে সরকার বা রাজনৈতিক দল বদলালেই কি সেই পৃষ্ঠপোষকতার চরিত্র বদলায়, নাকি শুধু পৃষ্ঠপোষকের পরিচয় বদলায়?

কারণ অপরাধী গ্রুপের হাতে যদি মাদক থাকে, অস্ত্র থাকে, অর্থ থাকে এবং রাজনৈতিক আশ্রয়ের ধারণা থাকে—তাহলে তারা কোনো একটি দলের সম্পদ নয়; তারা পুরো সমাজের জন্য একটি স্থায়ী হুমকি।

আর এই জায়গাতেই অপ্রিতিম হত্যাকাণ্ডের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি।

একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়া হয়তো একটি ফৌজদারি মামলার বিষয়। কিন্তু সেই হত্যাকাণ্ড যদি এমন একটি পরিবেশের ফল হয়, যেখানে কিশোরদের হাতে অস্ত্র, মাদক ও অপরাধের সুযোগ পৌঁছে যাচ্ছে, তাহলে দায় শুধু কয়েকজন কিশোরের ওপর চাপিয়ে দিলে মূল প্রশ্নটি আড়াল হয়ে যায়।

কে তাদের তৈরি করছে?

কে তাদের টাকা দিচ্ছে?

কে তাদের অস্ত্র বা মাদকের সঙ্গে যুক্ত করছে?

কে মামলা হলে পাশে দাঁড়াচ্ছে?

কে পুলিশি তৎপরতা ঠেকাতে প্রভাব খাটাচ্ছে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই কিশোরদের পেছনে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ‘বড় ভাই’রা কারা?

নারায়ণগঞ্জে কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে অভিযান নতুন নয়। কিন্তু যদি একদল কিশোরকে গ্রেপ্তার করার পর আরেক দল তৈরি হয়, তাহলে বুঝতে হবে সমস্যাটি কেবল কিশোরদের নয়; সমস্যাটি সেই কাঠামোর, যা তাদের অপরাধে ঠেলে দেয় এবং প্রয়োজনে ব্যবহার করে।

তাই অপ্রিতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে শুধু হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়। তদন্তের আওতায় আসা দরকার তাদের যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস, মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্ক, অস্ত্রের উৎস এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক বা স্থানীয় পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়ও।

নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রশ্ন এখন খুব সরল—কিশোর গ্যাং কি সত্যিই নির্মূল হবে, নাকি প্রতিবার রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে শুধু তাদের ‘বড় ভাই’ বদলাবে?

অপ্রিতিমের হত্যাকাণ্ডের বিচার সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটি সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত কি শুধু একজন বা কয়েকজন কিশোরের কাছে গিয়ে থেমে যাবে, নাকি পৌঁছাবে সেই অদৃশ্য নেটওয়ার্ক পর্যন্ত—যে নেটওয়ার্ক বছরের পর বছর ধরে নারায়ণগঞ্জের কিশোরদের অপরাধের পথে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে।