রফিকুল ইসলাম জীবন
সকাল গড়িয়ে দুপুর পার হচ্ছে, কিন্তু রান্নাঘরের চুলাটি বরাবরের মতোই বরফ হয়ে জমে আছে। ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আমার নিজের বাসাতেও আজ কয়েকদিন ধরে হাঁড়ি চড়েনি। শুধু আমার ঘর নয়, পুরো ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ কিংবা রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের সিংহভাগ আবাসিক এলাকার চিত্র আজ একই রকম। এক চরম ও নজিরবিহীন গ্যাস সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে কোটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবন। ক্ষুধার্ত মানুষের আহাজারি, রেস্তোরাঁগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি আর অন্যদিকে নিভে যাওয়া শিল্পকারখানার বয়লার—সব মিলিয়ে দেশ আজ এক অদৃশ্য জ্বালানি মহাবিপর্যয়ের মুখোমুখি।
নথিপত্র ও সরকারি সূত্র বলছে, গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড এবং সাম্প্রতিক সময়ে সমুদ্রে তীব্র বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন এলএনজি খালাস করতে না পারায় এই তীব্র ঘাটতি তৈরি হয়েছে। দৈনিক যেখানে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন, সেখানে সরবরাহ নেমে এসেছে ২২০ কোটি ঘনফুটের নিচে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একটি একক টার্মিনালের দুর্ঘটনা বা কয়েকদিনের বৈরী আবহাওয়া কেন পুরো দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে এভাবে তাসের ঘরের মতো ভেঙে দেবে? এই সংকট আসলে প্রকৃতির তৈরি নয়, এটি আমাদের দীর্ঘমেয়াদি ভুল নীতি ও আমদানিনির্ভরতার চরম খেসারত। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বছরের পর বছর অবহেলা করে, আজ দেশকে সম্পূর্ণভাবে আমদানিকৃত এলএনজির (LNG) ওপর নির্ভরশীল করে ফেলা হয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে বা সাগরে সামান্য ঢেউ উঠলেই বাংলাদেশের কোটি মানুষের রান্নাঘর বন্ধ হয়ে যায়।
এই ভুলের খেসারত সবচেয়ে বেশি দিচ্ছে নারায়ণগঞ্জ, যা দেশের অর্থনীতির ফুসফুস এবং বিশেষ করে নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল খাতের মূল চালিকাশক্তি। ফতুল্লা অঞ্চলের পোশাক কারখানাগুলোতে গ্যাসের চাপ এখন শূন্য থেকে ১ পিএসআই-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। যেখানে ডাইং বা স্পিনিং মিল সচল রাখতে নূন্যতম ১০ থেকে ১৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, সেখানে উৎপাদন প্রায় অর্ধেক বা তার চেয়েও বেশি কমে গেছে। সঠিক সময়ে বিদেশি বায়ারদের শিপমেন্ট দিতে না পারলে কোটি কোটি ডলারের অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে আমাদের পোশাক খাত।
যদি আগামী কয়েকদিনের মধ্যে এই গ্যাস সংকটের স্থায়ী সমাধান না করা যায়, তবে দেশকে অত্যন্ত ভয়াবহ কিছু পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমত, পোশাক কারখানাগুলো সময়মতো অর্ডার সরবরাহ করতে না পারলে বায়াররা অন্য দেশে চলে যাবে। এতে দেশের শীর্ষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাতটি গভীর সংকটে পড়বে এবং কারখানা বন্ধ হলে লাখ লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে পড়বেন, যা তীব্র সামাজিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে। দ্বিতীয়ত, দেশীয় উৎপাদন ব্যাহত হলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হবে। শিল্পের চাকা সচল রাখতে আরও বেশি এলএনজি চড়া দামে আমদানি করতে হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা ডলার সংকটের ওপর আরও বড় চাপ সৃষ্টি করবে।
একই সাথে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিং হচ্ছে। এর ফলে বাণিজ্যিক উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় নিত্যপণ্যের দাম আকাশছোঁয়া হবে। বিকল্প হিসেবে মানুষ এলপিজি সিলিন্ডার বা হোটেলের খাবারের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বিপুল পরিমাণে বেড়ে যাবে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। এর বাইরে জনস্বাস্থ্যের ওপরও একটি দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে মাটির চুলা, কেরোসিন বা নিম্নমানের কাঠ পুড়িয়ে রান্না করছে, যার ধোঁয়া ফুসফুসের জন্য চরম ক্ষতিকর। এছাড়া দিনের পর দিন হোটেল বা অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়ায় তৈরি বাসি খাবার খাওয়ার কারণে সাধারণ মানুষের পেটের পীড়াসহ নানা রোগব্যাধি বাড়ছে।
সরকার ও পেট্রোবাংলা থেকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে যে আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে। কিন্তু এই সাময়িক জোড়াতালির সমাধান দিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আজ ফতুল্লার যে চুলাটি বন্ধ, তা কেবল একটি পরিবারের রান্নার সমস্যা নয়; এটি দেশের অর্থনীতির চাকা থমকে যাওয়ার আগাম সতর্কবার্তা। আমদানিনির্ভর ভুল নীতি থেকে বের হয়ে এসে অবিলম্বে দেশের স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরে নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে যুদ্ধকালীন তৎপরতা চালাতে হবে। তা না হলে, আজ যে সংকট কেবল রান্নাঘরে শুরু হয়েছে, তা আগামীকাল পুরো দেশের অর্থনীতিকে গিলে খাবে।




