নারায়ণগঞ্জে বেপরোয়া অটো রিকশা চালকরা

নিবন্ধনের আওতায় এনে ভাড়া নির্ধারণের দাবি

281

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জ শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা দিন দিন বাড়লেও এসব যানবাহনের চলাচল ও ভাড়া নির্ধারণে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ যাত্রীরা। ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়, যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার, যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা এবং নারী যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও রয়েছে। এ অবস্থায় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোকে দ্রুত নিবন্ধনের আওতায় এনে প্রতিটি রুটে সরকারিভাবে ভাড়া নির্ধারণের দাবি উঠেছে।

নগরবাসীর অভিযোগ, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে অটোরিকশার ভাড়া নির্ধারণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে একই দূরত্বে একেক চালক একেক ধরনের ভাড়া দাবি করছেন। যাত্রী ভাড়া নিয়ে আপত্তি জানালে অনেক সময় চালকের সঙ্গে বাকবিতণ্ডা হচ্ছে। অতিরিক্ত ভাড়া দিতে অস্বীকৃতি জানালে যাত্রীকে গাড়ি থেকে নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে নারী যাত্রীদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন যাত্রী। ভাড়া নিয়ে তর্কের সময় উচ্চস্বরে কথা বলা, অসৌজন্যমূলক মন্তব্যসহ নানা ধরনের দুর্ব্যবহারের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ তাদের। তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেন না।

নগরবাসীর মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য অটোরিকশা বন্ধ করে দেওয়া কোনো বাস্তবসম্মত সমাধান নয়। বরং এগুলোকে একটি সুশৃঙ্খল ব্যবস্থার মধ্যে আনা প্রয়োজন। এজন্য প্রতিটি অটোরিকশার নিবন্ধন, মালিক ও চালকের তথ্য সংরক্ষণ এবং গাড়িতে নিবন্ধন নম্বর ও চালকের পরিচয় দৃশ্যমানভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ শহরের প্রতিটি রুটের দূরত্ব ও যাত্রীসংখ্যা বিবেচনা করে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে নির্ধারিত ভাড়া ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন যাত্রীরা। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা প্রতিটি অটোরিকশায় দৃশ্যমান স্থানে টানিয়ে রাখলে চালক ও যাত্রী উভয়ের মধ্যে ভাড়া নিয়ে বিরোধ অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা।

নগরবাসীর আরও দাবি, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করলে চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ থাকতে হবে। এজন্য অটোরিকশায় অভিযোগ জানানোর নম্বর বা একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ ব্যবস্থাও চালু করা যেতে পারে। কোনো চালকের বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার নিবন্ধন বা চলাচলের অনুমতি বাতিলের মতো শাস্তির ব্যবস্থাও থাকা প্রয়োজন।

অটোরিকশাচালকদের একটি অংশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগের পাশাপাশি তাদেরও নানা সমস্যা রয়েছে। গাড়ির মালিককে দৈনিক জমা, ব্যাটারি চার্জ, মেরামত ও অন্যান্য খরচ বহন করতে হয়। তাদের মতে, কর্তৃপক্ষ ভাড়া নির্ধারণের সময় এসব খরচ বিবেচনায় নিলে চালক ও যাত্রী উভয়ের জন্যই একটি গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।

সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন অটোরিকশাচালক দিনে প্রায় দুই হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন। তবে এটি চালকের নিট আয় নয়। দৈনিক জমা, চার্জ, মেরামতসহ বিভিন্ন খরচ বাদ দিলে প্রকৃত আয় কমে আসে। তাই ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে চালকের খরচ ও যাত্রীর সক্ষমতা—দুই দিকই বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে অটোরিকশা চার্জ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। নগরীর বিভিন্ন স্থানে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অটোরিকশার ব্যাটারি চার্জ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন নাগরিকরা।

অন্যদিকে, অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচলের কারণে নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে যানজটও বাড়ছে। নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড না থাকায় অনেক চালক সড়কের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করান। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং পথচারীদেরও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

সচেতন নাগরিকদের মতে, নারায়ণগঞ্জ শহরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে গণপরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে এর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা তৈরি করা জরুরি। নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট, নির্ধারিত ভাড়া, চালকের পরিচয়, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনা—সবকিছু একটি নিয়মের মধ্যে আনতে হবে।

তাদের মতে, একটি নিবন্ধিত অটোরিকশা ব্যবস্থার ফলে শুধু যাত্রী হয়রানি ও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ই কমবে না, দুর্ঘটনা বা কোনো অপরাধের ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট গাড়ি ও চালককে শনাক্ত করাও সহজ হবে। পাশাপাশি নগরীতে কতসংখ্যক অটোরিকশা চলছে, কোন রুটে কতটি চলবে এবং কোথায় এগুলোর স্ট্যান্ড হবে—এসব বিষয়েও কর্তৃপক্ষ কার্যকর পরিকল্পনা নিতে পারবে।

নগরবাসীর প্রত্যাশা, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসন, ট্রাফিক বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্তৃপক্ষ সমন্বিতভাবে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় এনে দ্রুত একটি বাস্তবসম্মত ভাড়া কাঠামো নির্ধারণ করবে। এতে চালকদের জীবিকা যেমন সুরক্ষিত হবে, তেমনি সাধারণ যাত্রীরাও অতিরিক্ত ভাড়া ও হয়রানি থেকে রক্ষা পাবেন।