দেশে থেকে জেল খাটলেও মূল্যায়ন পাবেন না আইভী?

ফিরে আসার সুযোগ পেলে পলাতকরাই কি হবেন রাজনৈতিক হিরো?

150

নিজস্ব প্রতিবেদক :

রাজনীতিতে যদি আবারও দেশে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়, তাহলে সংকটের সময় দেশ ছেড়ে যাওয়া নেতারাই কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক হিরো হয়ে উঠবেন? আর যারা কঠিন পরিস্থিতিতেও দেশে থেকে মামলা, গ্রেপ্তার, জেল-জুলুম ও রাজনৈতিক চাপ মোকাবিলা করেছেন, তারা কি হারিয়ে যাবেন রাজনীতির আড়ালে? নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এমন প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। বর্তমানে দেশে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ।

বিশেষ করে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিদের একটি বড় অংশ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার বাস্তবতার পর ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে ‘কে কোথায় ছিলেন’ এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের বিষয়টিও এ আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতে যদি রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে যায় এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতারা দেশে ফিরে এসে সক্রিয় রাজনীতিতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান, তাহলে তারা খুব সহজেই নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাবেন। তারা বলতে পারেন, দলের শীর্ষ নেতা শেখ হাসিনা থেকে শুরু করে মন্ত্রী-এমপিরাও যখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন, তখন তাদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা তৈরি হয়েছিল।

এই যুক্তিই তখন তাদের রাজনৈতিকভাবে আবার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথ খুলে দিতে পারে।

কিন্তু বিপরীত চিত্র দেখা যেতে পারে তাদের ক্ষেত্রে, যারা দেশ ছাড়েননি। যারা রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশে থেকে মামলা, জেল-জুলুম, হয়রানি কিংবা নানা চাপ মোকাবিলা করেছেন, তাদের ত্যাগ তখন রাজনৈতিক প্রচারণার বড় ঢেউয়ের নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এ প্রসঙ্গে সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর নাম সামনে আসছে। তার সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময়েও তিনি দেশ ছাড়েননি এবং নানা মামলা ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও দেশে অবস্থান করেছেন। তাদের প্রশ্ন—যদি ভবিষ্যতে বিদেশে থাকা প্রভাবশালী নেতারা দেশে ফিরে আবার রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে আইভীর মতো যারা দেশে থেকে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, তাদের সেই ভূমিকার মূল্যায়ন কোথায় থাকবে?

তৃণমূলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের আশঙ্কা, রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি অনেক সময় খুবই সংক্ষিপ্ত হয়ে যায়। ক্ষমতার সমীকরণ বদলালে গতকালকের বিতর্কিত নেতা পরদিনই হয়ে উঠতে পারেন জনপ্রিয় নেতা। আর সেই নতুন বয়ানের মধ্যে সংকটের সময়ে কে পাশে ছিলেন, কে ছিলেন না—সেটি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।

গত কয়েক দিনে সাবেক এমপি শামীম ওসমানের বিভিন্ন বক্তব্যও নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। তার বক্তব্যে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সম্ভাবনার ইঙ্গিত রয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। ফলে তার মতো প্রভাবশালী নেতারা দেশে ফিরলে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির পুরনো ক্ষমতার সমীকরণ কতটা ফিরে আসবে, সেটিও এখন আলোচনার বিষয়।

তবে প্রশ্নটি শুধু শামীম ওসমানকে ঘিরে নয়। বরং এটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির একটি বড় নৈতিক প্রশ্ন সংকটের সময় দেশ ছেড়ে যাওয়া কি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে উঠবে?

যদি তা-ই হয়, তাহলে মাঠে থাকা নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। কারণ একজন তৃণমূল কর্মী যখন মামলা, গ্রেপ্তার কিংবা রাজনৈতিক হয়রানির ঝুঁকি নিয়ে দেশে অবস্থান করেন, তখন তার প্রত্যাশা থাকে দল ও নেতৃত্বের কাছে সেই ত্যাগের মূল্য থাকবে।

কিন্তু কয়েক বছর পর পরিস্থিতি বদলে গিয়ে যদি বিদেশে থাকা নেতারাই আবার দলের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন, তাহলে সেই তৃণমূল কর্মীর প্রশ্ন উঠতেই পারে তাহলে কঠিন সময়ে আমরা কেন মাঠে ছিলাম?

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ভবিষ্যতের রাজনীতিতে শুধু কে কত বড় নেতা, কতবার এমপি হয়েছেন কিংবা দলের কতটা নিয়ন্ত্রণ ছিল এসব দিয়ে নেতৃত্বের মূল্যায়ন হলে চলবে না। বরং সংকটের সময় নেতার অবস্থান, নেতাকর্মীদের পাশে থাকার সাহস এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দেশের মাটিতে থাকার বিষয়টিও রাজনৈতিক মূল্যায়নের অংশ হওয়া উচিত।

কারণ রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার সময়ের ভূমিকার চেয়ে অনেক সময় সংকটের সময়ের অবস্থানই একজন নেতার প্রকৃত রাজনৈতিক চরিত্র নির্ধারণ করে।

এখন দেখার বিষয়, ভবিষ্যতে রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দেশে ফিরে আসা নেতারাই কি আবার হিরো হয়ে উঠবেন, নাকি যারা দেশেই থেকে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, সেলিনা হায়াৎ আইভীর মতো নেতাদের ত্যাগ ও ভূমিকা নতুন করে মূল্যায়িত হবে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে উত্তরটি শুধু একটি দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে না; বরং সংকটের সময়ে রাজনীতিতে থেকে যাওয়ার মূল্য আদৌ কতটা সেটিও নির্ধারণ করবে। ##