নাসিক প্রশাসক ও ডিসিকে আরও তৎপর হওয়ার দাবি

নারায়ণগঞ্জ কি এবারও ডেঙ্গুর হটস্পট হবে?

38

রফিকুল ইসলাম জীবন :

নারায়ণগঞ্জে আবারও ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি। বর্ষা শেষ হওয়ার আগেই নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে ইতোমধ্যে ‘রেড জোন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২২ নম্বর ওয়ার্ডসহ নগরীর আরও কয়েকটি এলাকা এবং ফতুল্লা-সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এডিস মশার প্রজননস্থল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রশ্ন উঠেছে—নারায়ণগঞ্জ কি এবারও ডেঙ্গুর হটস্পট হতে যাচ্ছে?

গত বছরের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনও নারায়ণগঞ্জবাসীর স্মৃতিতে তাজা। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে জেলার বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগীর চাপ বেড়েছিল। প্রাণও গেছে বহু মানুষের। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল পরিবারগুলোর মধ্যে। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার আগেভাগেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এখনও আরও অনেক কিছু করার রয়েছে।

নগরীর বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি, অপরিচ্ছন্ন ড্রেন, খাল-নালা, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত পাত্র ও বর্জ্যের স্তূপ এডিস মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি করছে। ফতুল্লা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও ডোবা-নালা ও জলাশয়কে সম্ভাব্য প্রজননস্থল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাগডোমারী খালসহ বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু হলেও প্রশ্ন হচ্ছে—এসব কার্যক্রম কতটা নিয়মিত, কতটা কার্যকর এবং কতটা বিস্তৃত?

শুধু ফগিং করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। মশা নিধনের পাশাপাশি এডিসের প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একটি বাড়ির সামনে ধোঁয়া ছড়িয়ে চলে গেলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না; ওই বাড়ির ছাদে, আশপাশের ড্রেনে, নির্মাণাধীন ভবনে কিংবা পরিত্যক্ত জায়গায় জমে থাকা পানি যদি থেকে যায়, তাহলে সেখানেই আবার মশার জন্ম হবে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডকে রেড জোন ঘোষণা করার ঘটনা তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এটি কেবল একটি ওয়ার্ডের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আজ ৩ নম্বর ওয়ার্ড, কাল অন্য কোনো ওয়ার্ড—এভাবেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত লার্ভা শনাক্তকরণ, প্রজননস্থল ধ্বংস এবং আক্রান্ত রোগীর বাড়ির আশপাশে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

এক্ষেত্রে নাসিক প্রশাসকের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে ফতুল্লা ও সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোতেও সমন্বিতভাবে অভিযান জোরদার করতে হবে। সিটি করপোরেশন ও জেলা প্রশাসনের কার্যক্রম যেন আলাদা আলাদা কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; প্রয়োজন সমন্বিত, ধারাবাহিক ও দৃশ্যমান অভিযান।

আরেকটি বিষয়ও এখনই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে—হাসপাতাল প্রস্তুতি।

ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়লে নারায়ণগঞ্জের সরকারি হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়বে। নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল ও ৩০০ শয্যা হাসপাতালসহ চিকিৎসাকেন্দ্রগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর জন্য পর্যাপ্ত শয্যা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর প্রস্তুতি এখন থেকেই নিশ্চিত করা দরকার। রোগীর চাপ বাড়ার পর প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ খুব কম থাকে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আরেকটি বিপজ্জনক প্রবণতা হলো—জ্বর কমে যাওয়ার পরও রোগীর অবস্থা গুরুতর হতে পারে। ফলে নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার বিষয়টি ব্যাপকভাবে প্রচার করা প্রয়োজন।

সবচেয়ে বড় কথা, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদেরও সম্পৃক্ত করতে হবে। শুধু সিটি করপোরেশনের কর্মীরা রাস্তা ও বাড়ির সামনে ওষুধ ছিটিয়ে চলে গেলে হবে না। প্রত্যেক বাড়ির মালিক, নির্মাণাধীন ভবনের মালিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিজ নিজ এলাকায় জমে থাকা পানি ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।

তবে নাগরিকদের দায়িত্বের কথা বলার আগে প্রশাসনের দায়িত্বও নিশ্চিত করতে হবে। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য অপসারণ, ড্রেন ও খাল পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং মশার প্রজননস্থল শনাক্তে কার্যকর নজরদারি ছাড়া শুধু সচেতনতামূলক প্রচারণায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

গত বছরের প্রাণহানির ঘটনা নারায়ণগঞ্জের প্রশাসনের জন্য যথেষ্ট সতর্কবার্তা। এবার যেন সেই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি না ঘটে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় দাবি।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং জেলা প্রশাসককে তাই আরও তৎপর হতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ ওয়ার্ড চিহ্নিত করে বসে থাকলে চলবে না; প্রতিটি ওয়ার্ডে নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। ফতুল্লা ও সদর উপজেলার ইউনিয়নগুলোতেও একই সঙ্গে অভিযান জোরদার করতে হবে।

কারণ ডেঙ্গু যখন দরজায় কড়া নাড়ছে, তখন অপেক্ষা করে আক্রান্তের সংখ্যা গোনার সময় নেই। আগেই ব্যবস্থা নিতে হবে। একটি প্রাণও যেন অবহেলা, সমন্বয়হীনতা কিংবা প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে হারিয়ে না যায়।

নারায়ণগঞ্জ কি এবারও ডেঙ্গুর হটস্পট হবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো নির্ধারিত নয়। কিন্তু সেই উত্তর যাতে ‘হ্যাঁ’ না হয়, তার দায়িত্ব এখন প্রশাসনের পাশাপাশি পুরো নগরবাসীর।