পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নজিরবিহীন কড়া ভাষা; শেখ হাসিনাকে ঘিরে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেও বাড়ছে টানাপোড়েন...

শেখ হাসিনাকে ‘গণহত্যাকারী’ ও ‘মাফিয়া চক্রের প্রধান’ বলল ঢাকা, দিল্লি-ঢাকা সম্পর্কে নতুন উত্তাপ

281

নিজস্ব প্রতিবেদক:
শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে ব্যবহৃত ভাষা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ছাড়িয়ে কূটনৈতিক মহলেও ব্যাপক তাৎপর্য তৈরি করেছে। বিবৃতিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী’ (Convicted Genocider), ‘দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যামূলক খুনি’ (Convicted Mass Murderer), ‘মাফিয়া চক্রের প্রধান’ (Head of a Mafia Enterprise) এবং ‘দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী’ (Convicted Criminal) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একজন সাবেক সরকারপ্রধানকে নিয়ে একটি রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এমন একাধিক কঠোর অভিধার ব্যবহার বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান এবং শেখ হাসিনা ইস্যুতে সরকারের অনড় অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘convicted mass murderer Hasina and her mafia enterprise will never have a place in the polity of Bangladesh’। একই সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রেখে বাংলাদেশ আর কখনো ‘ফ্যাসিবাদের অন্ধকার সময়ে’ ফিরে যাবে না এবং কোনো ‘client State’ হবে না বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কূটনৈতিক ভাষায় সাধারণত রাষ্ট্রগুলো ব্যক্তি আক্রমণাত্মক শব্দ এড়িয়ে অপেক্ষাকৃত সংযত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা ব্যবহার করে। সেখানে শেখ হাসিনাকে ‘Convicted Genocider’, ‘Convicted Mass Murderer’, ‘Head of a Mafia Enterprise’ এবং ‘Convicted Criminal’ হিসেবে একই বিবৃতিতে উল্লেখ করা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা বহন করে। এর মাধ্যমে ঢাকা শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তার অবস্থানই জানায়নি, ভারতের মাটিতে অবস্থান করে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তাঁর বক্তব্য দেওয়ার বিষয়েও নিজেদের কঠোর আপত্তি স্পষ্ট করেছে।

শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি ইতোমধ্যেই ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ভারত ওই রায়ের বিষয়ে জানিয়েছিল যে তারা বিষয়টি লক্ষ্য করেছে এবং বিচারপ্রক্রিয়া সম্পর্কে নিজেদের অবস্থানও প্রকাশ করেছিল। ফলে প্রত্যর্পণ প্রশ্নে দুই দেশের অবস্থানের দূরত্ব এখনো স্পষ্ট।

সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সেখানে তিনি বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে সমালোচনা করেন এবং দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও জানান। তাঁর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে তীব্র আপত্তি জানানো হয়। অন্যদিকে নয়াদিল্লি জানিয়েছে, শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের আয়োজনে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না এবং এটি কোনো সরকারি ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিল না।

তবে ঢাকার দৃষ্টিতে বিষয়টি কেবল একটি ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার মনে করছে, ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে শেখ হাসিনার বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে সক্রিয় থাকা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য স্পর্শকাতর পরিস্থিতি তৈরি করছে। ফলে শেখ হাসিনার অবস্থান এবং তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য এখন সরাসরি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

শেখ হাসিনা ইস্যুর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে দুই দেশের পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থায়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সীমান্ত নিরাপত্তা, যোগাযোগ, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা আমূল বদলে যায়। সেই পরিবর্তনের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।

বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতের ভূমিকা নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শেখ হাসিনাকে ভারতে অবস্থানের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভারতের মাটিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য। ফলে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মধ্যে ভারতের প্রতি বিরূপ মনোভাব আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রত্যর্পণ ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে পারে। ঢাকা শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে ভারত এখন পর্যন্ত তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়নি। ফলে বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদি কূটনৈতিক অচলাবস্থার কারণ হতে পারে।

শুধু রাজনৈতিক সম্পর্ক নয়, এর প্রভাব পড়তে পারে দুই দেশের বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি বণ্টন, জ্বালানি, যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রেও। যদিও এসব সহযোগিতা দুই দেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত, তবু সামগ্রিক রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি হলে এসব বিষয়ে আলোচনার পরিবেশও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

তবে শেখ হাসিনা ইস্যুতে উত্তেজনা বাড়লেও ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা কম। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সীমান্ত, বিপুল বাণিজ্য, অভিন্ন নদী, জ্বালানি ও যোগাযোগসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ জড়িত। ফলে রাজনৈতিক মতপার্থক্য যতই তীব্র হোক, বাস্তব প্রয়োজনেই দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখতে হবে।

এই বাস্তবতায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক বিবৃতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ভাষা। একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ‘দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী’, ‘দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যামূলক খুনি’, ‘মাফিয়া চক্রের প্রধান’ এবং ‘দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী’ হিসেবে উল্লেখ করা শুধু শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানকেই প্রকাশ করে না, এর মাধ্যমে ভারতকেও একটি পরোক্ষ কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হয়েছে।

বার্তাটি হলো—শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, তাঁর ভারতে অবস্থান এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি ঢাকা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখছে না; বরং এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে।

ফলে শেখ হাসিনা ইস্যুতে ঢাকা ও দিল্লির দূরত্ব আগামী দিনগুলোতে আরও বাড়ে, নাকি দুই দেশ বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় উত্তেজনা কমিয়ে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে—সেটিই এখন ভারত-বাংলাদেশ কূটনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।