ওমর আলী স্কুলের সেই ঘটনা

ভাইরাল সেই লাথির ভিডিওর নেপথ্যে কী? তদন্তে মিলল ভিন্ন তথ্য

290

নিজস্ব প্রতিবেদক :

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একটি কিশোরকে এক কিশোরীকে লাথি মারতে দেখা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। একপর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করা হয়, ঘটনার জেরে মেয়েটিকে স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে সেই দাবির সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যায়নি।

ঘটনাটি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেয়েটিকে স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয়নি। বরং তাকে একটি কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। একই সঙ্গে ঘটনার পেছনে শুধু একতরফাভাবে মেয়েটির ওপর হামলার বিষয় নয়, এর আগে ছেলেদের পক্ষ থেকে মেয়েদের সঙ্গে দুষ্টুমি ও হাতাহাতির ঘটনাও ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।

ঘটনাটি নারায়ণগঞ্জের ওমর আলী স্কুলকে ঘিরে। স্কুলের প্রিন্সিপাল আবদুল মতিন এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আতিকুর রহমানের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। জেলা শিক্ষা অফিসের সরকারি ওয়েবসাইটেও মো. আতিকুর রহমানকে বর্তমানে জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওতে লাথির শিকার হওয়া শিক্ষার্থীর নাম ফারিয়া আলম মীম। সে বর্তমানে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ছে। তার সঙ্গে থাকা আরেক কিশোরী মীম খাতুন সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। দুজনের বয়সই ১২ বছর। তবে শ্রেণির ব্যবধানের কারণ হিসেবে জানা গেছে, দুজনেরই পড়াশোনায় একাধিকবার ক্লাস ড্রপ হওয়ায় বয়সের সঙ্গে শ্রেণির সামঞ্জস্য নেই।

সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন কয়েকজন ছেলে ও মেয়ের মধ্যে দুষ্টুমি নিয়ে প্রথমে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। ছেলেরা প্রথমে মেয়েদের একজনকে থাপ্পড় দেয়। পরে মেয়েটি তাদের বকাঝকা করলে ছেলেদের একজন আবার ফিরে এসে তাকে লাথি মারে। ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা যায়, মেয়েটির আচরণ নিয়েও আগে স্কুলে অভিযোগ ছিল। ঘটনার পর তার মায়ের উপস্থিতিতেই এক শিক্ষক দাবি করেন, এর আগেও মেয়েটির আচরণ নিয়ে কয়েকবার অভিযোগ স্কুল কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিস্তারিত বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা যায়নি।

অন্যদিকে, ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল হওয়ার পর স্থানীয়ভাবে বিষয়টি মীমাংসা ও প্রকৃত ঘটনা জানার উদ্যোগ নেন স্থানীয় ব্যক্তি আশরাফুল ইসলামসহ কয়েকজন। গত বৃহস্পতিবার তারা স্কুলে গিয়ে প্রধান শিক্ষক আবদুল মতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মহিউদ্দিনও উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় উদ্যোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আশরাফুল ইসলাম জানান, তারা ছেলেটি ও তার বাবাকে ডেকে ঘটনার বিষয়ে কথা বলেন। ছেলেটি জানায়, আগে থেকেই মেয়েটির সঙ্গে তার পরিচয় ছিল এবং দুষ্টুমি করেই তাকে লাথি দিয়েছিল। তবে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে তাকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়, পরিচিত হওয়া বা দুষ্টুমি কোনোভাবেই রাস্তায় একটি মেয়েকে লাথি মারার যথাযথ কারণ হতে পারে না।

পরে ছেলেটির বাবার সামনেই তাকে শাস্তি দেওয়া হয় এবং পরিবারটিকে এলাকা ছেড়ে যাওয়ার জন্য বলা হয় বলে জানান আশরাফুল ইসলাম। এ সময় পুলিশও সেখানে এসেছিল বলে তিনি জানান। তবে পুলিশ ছেলেটিকে তার বাড়িতে না পাওয়ায় তাকে পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ঘটনার পর স্কুল কর্তৃপক্ষের দেওয়া নোটিশ নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এটি কোনো টিসি বা স্কুল থেকে বহিষ্কারের নোটিশ নয়, বরং কারণ দর্শানোর নোটিশ। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেটিকে টিসি হিসেবে প্রচার করা হয়েছে।

ঘটনাটি নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা শিক্ষা অফিসও বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছে বলে জানা গেছে। জেলা শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মো. আতিকুর রহমানের বক্তব্যও এ বিষয়ে নেওয়া হয়েছে।

সব মিলিয়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওটি যে পুরো ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরছে না, অনুসন্ধানে তারই ইঙ্গিত মিলেছে। ভিডিওতে মেয়েটিকে লাথি মারার দৃশ্যটি স্পষ্ট হলেও তার আগে কী ঘটেছিল, ছেলেদের ভূমিকা কী ছিল এবং স্কুল কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব বিষয়ও সামনে এসেছে।

তবে শিশুদের জড়িত এমন ঘটনায় শাস্তির পাশাপাশি তাদের আচরণগত সমস্যা, পারিবারিক নজরদারি এবং বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও কাউন্সেলিংয়ের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।