মাত্র ১৫ লাখ সরকারী কর্মচারীর বেতন বাড়িয়ে ১৮ কোটি মানুষের তেলের দাম বাড়ানো কোন যুক্তিতে?

109

রফিকুল ইসলাম জীবন

মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে ডিজেল, পেট্রল, অকটেন ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। অর্থাৎ বছরের ব্যবধান তো নয়ই, কয়েক মাসের মধ্যেই দ্বিতীয় দফায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ের ওপর নতুন চাপ তৈরি হলো।

এর মধ্যেই নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোয় গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা হয়েছে। বর্ধিত বেতন ধাপে ধাপে কার্যকর হচ্ছে।

সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো নিয়ে আপত্তির কোনো কারণ নেই। দীর্ঘদিন পর বেতন কাঠামো সংশোধনের প্রয়োজন থাকলে রাষ্ট্র সেটি করতেই পারে। মূল্যস্ফীতির কারণে সরকারি কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে—এটিও বাস্তবতা। কিন্তু একই বাস্তবতার মধ্যে দেশের বাকি জনগোষ্ঠী কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

মূল্যস্ফীতির আঘাত কি শুধু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর পড়েছে? বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, পরিবহনকর্মী কিংবা নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কি বাড়েনি? তাদের আয় কি একই হারে বেড়েছে?

বাস্তবতা হচ্ছে, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় বাড়ার নিশ্চয়তা নেই। অথচ জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে তাদের ব্যয় বাড়ার নিশ্চয়তা প্রায় নিশ্চিত।

নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা, অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ থেকে ১৫৫ টাকা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের বিপুল লোকসানের কারণে এই মূল্য সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিপিসির লোকসান প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা হয়েছে বলেও সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

সরকারের এই যুক্তি অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্কিত—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের ওপর তার চাপ পড়বেই। কিন্তু এখানেই সরকারের দায়িত্ব আরও বড় হয়ে যায়। কারণ রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানের লোকসান কমানোর সিদ্ধান্তের প্রভাব যদি দেশের কোটি কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের সামাজিক মূল্যও হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে।

ডিজেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শুধু ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকের খরচ বাড়ে না। গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, কৃষির সেচ, শিল্পের উৎপাদন, নির্মাণকাজ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয়ও বাড়ে। এক পর্যায়ে সেই বাড়তি ব্যয় পণ্যের দামে যুক্ত হয়। ফলে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ার চাপ তৈরি হয়। শেষ পর্যন্ত যে মানুষটি নিজের জীবনে এক লিটার ডিজেলও ব্যবহার করেন না, তাকেও বাড়তি মূল্য দিতে হয়।

এ কারণেই জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি কোনো বিচ্ছিন্ন অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি সরাসরি মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে যুক্ত।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আয় ও ব্যয়ের এই অসম সমীকরণ। একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তে বাড়ানো সম্ভব। কিন্তু একজন রিকশাচালক, দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা নিম্নবেতনের বেসরকারি কর্মচারীর আয় একইভাবে বাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাষ্ট্রের নেই। ফলে তাদের জন্য জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির অর্থ হলো বাড়তি ব্যয়, কিন্তু বাড়তি আয়ের নিশ্চয়তা নয়।

এই জায়গাতেই সরকারের নীতির জনস্বার্থ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।

একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো উন্নত করা হচ্ছে, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আয় বৃদ্ধির ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে—এই প্রশ্নের উত্তরও জনগণ জানতে চায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর যে প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে, তাতেও মানুষের অর্থনৈতিক চাপের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। বিভিন্ন পোস্ট ও আলোচনায় পরিবহন ব্যয়, বাজারদর এবং জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন অনেকে। একই সঙ্গে সরকারের সিদ্ধান্তের পক্ষে আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার কথাও কেউ কেউ বলছেন। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়াকে পুরো দেশের জনমতের বৈজ্ঞানিক জরিপ বলা যাবে না। তবে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ ও অসন্তোষের একটি দৃশ্যমান চিত্র সেখানে পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারের জন্য এই প্রতিক্রিয়া উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। কারণ একটি সরকারের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা শুধু নির্বাচনী ফল কিংবা সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ওপর নির্ভর করে না। জনগণ প্রতিদিনের জীবনযাত্রার অভিজ্ঞতা দিয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে। বাজারে গিয়ে কত টাকা খরচ হচ্ছে, বাসভাড়া কত বাড়ছে, পরিবারের মাসিক ব্যয় কতটা বেড়েছে—এসব বাস্তব অভিজ্ঞতাই শেষ পর্যন্ত মানুষের রাজনৈতিক মনোভাবকে প্রভাবিত করে।

নতুন সরকারের জন্য এখানেই বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। ক্ষমতায় আসার পর জনগণের প্রত্যাশা থাকে জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে, বাজারে স্বস্তি ফিরবে, অর্থনীতিতে গতি আসবে এবং সাধারণ মানুষের আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য উন্নত হবে। এর বিপরীতে যদি ধারাবাহিকভাবে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় বাড়তে থাকে, তাহলে সরকারের জনবান্ধবতার দাবি নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে।

তবে এটাও সত্য যে সরকারের সামনে সহজ কোনো পথ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং বিপিসির লোকসান—সবকিছুই সরকারের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তকে কঠিন করে তুলছে। কিন্তু সংকট থাকলেই জনগণের ওপর পুরো বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন আসে না। সংকটের বোঝা কীভাবে ন্যায্যভাবে ভাগ করা হবে, সেটিই রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা।

সরকার চাইলে জ্বালানি খাতে অপচয় ও অনিয়ম কমানোর উদ্যোগ আরও জোরদার করতে পারে। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমানো, বাজার সিন্ডিকেট ও মজুতদারি নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন খাতে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি ঠেকানো এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণের পূর্ণাঙ্গ হিসাব জনগণের সামনে আরও স্বচ্ছভাবে তুলে ধরতে পারে।

কারণ জনগণ শুধু জানতে চায় না যে তেলের দাম কেন বাড়ানো হয়েছে; তারা জানতে চায়, এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের যে বাড়তি ব্যয় হবে, তা কমাতে সরকার কী করছে।

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো প্রয়োজন হলে অবশ্যই বাড়ানো হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের বিষয়টিও রাষ্ট্রকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রের অর্থনীতি কোনো একটি শ্রেণির জন্য নয়; রাষ্ট্রের অর্থনীতি দেশের সব নাগরিকের জন্য।

সবচেয়ে বড় কথা, সরকারের অর্থনৈতিক নীতি শুধু হিসাবের খাতায় সফল হলেই জনগণের কাছে সফল হয় না। সেই নীতির প্রভাব মানুষের রান্নাঘরে, বাজারের ব্যাগে, যাতায়াতের খরচে এবং মাসের শেষে পরিবারের হাতে থাকা টাকার পরিমাণে প্রতিফলিত হতে হয়।

আজ তাই প্রশ্নটি খুবই সরল—মাত্র ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি করে ১৮ কোটি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেওয়া কতটা ন্যায়সংগত?

বিপিসির লোকসান কমানো প্রয়োজন হতে পারে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এই দুই সিদ্ধান্তের মাঝখানে যে কোটি কোটি সাধারণ মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, তাদের স্বার্থও রাষ্ট্রকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

কারণ জনগণের পকেট থেকে অর্থ নিয়ে রাষ্ট্রের হিসাব মেলানো যত সহজ, জনগণের আস্থা ধরে রাখা তত সহজ নয়।

সরকারের এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে—অর্থনীতির চাপ সামলানোর পথ কি শুধু জনগণের ওপর নতুন বোঝা চাপানো হবে, নাকি রাষ্ট্র নিজেও সেই সংকটের একটি অংশ বহন করবে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু অর্থনীতির নয়; এর সঙ্গে সরকারের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে।

রফিকুল ইসলাম জীবন
সাংবাদিক