অন্য বিএনপি নেতারা কি শামীম ওসমানকে এখনো ভয় পান?...

একমাত্র টিপু ছাড়া না.গঞ্জে আর কেউ শামীম ওসমানের বক্তব্যের জবাব দিলেন না কেন?

304

নিজস্ব প্রতিনিধি:

বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য ও রাজনৈতিক তৎপরতা ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তার বক্তব্যের জবাবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু প্রকাশ্যে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানালেও জেলার বিএনপির অন্য শীর্ষ নেতাদের অধিকাংশই এখন পর্যন্ত অনেকটা নীরব।

এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে—শামীম ওসমানের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার মতো সাহস কি নারায়ণগঞ্জের অন্য বিএনপি নেতাদের নেই? নাকি অতীতের রাজনৈতিক প্রভাব ও ভয় এখনো তাদের মনে কাজ করছে?

সম্প্রতি দেওয়া বক্তব্যে শামীম ওসমান তার রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি দেশে ফেরার ইঙ্গিত দিয়েছেন। অতীতের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নানা মন্তব্য করেছেন তিনি। তার বক্তব্যের বিভিন্ন অংশ নিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হলেও প্রকাশ্যে পাল্টা জবাব দিতে দেখা যাচ্ছে না বিএনপির অনেক নেতাকে।

শামীম ওসমানের বক্তব্যের পর বিএনপির পক্ষ থেকে সবচেয়ে সরব প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপু। সম্প্রতি এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে শামীম ওসমানের কঠোর সমালোচনা করে টিপু তাকে উদ্দেশ্য করে নানা মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকাকালে শামীম ওসমান প্রভাব দেখিয়েছেন, আর ক্ষমতা হারানোর পর দেশ ছেড়ে বিদেশে অবস্থান করছেন। প্রবাসে বসে বক্তব্য না দিয়ে সাহস থাকলে নারায়ণগঞ্জের মাটিতে এসে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ারও চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।

টিপুর এই বক্তব্যের পরই পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় আওয়ামী লীগপন্থী মহলে। শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আক্রমণাত্মক পোস্ট দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই পোস্টে টিপুকে কুরুচিপূর্ণ ভাষায় আক্রমণ এবং তাকে ‘লেংটা করে পিটানোর’ হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।

এ ঘটনার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দেয় ক্ষোভ। পাশাপাশি টিপুকে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন করে হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। ওই ফোনে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার পরিণতি ভালো হবে না বলে সতর্ক করার পাশাপাশি শারীরিক ক্ষতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

টিপুকে ঘিরে যখন এতটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অন্য নেতারা কোথায়?

জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের বিএনপি নেতারা অতীতে শামীম ওসমান ও তার পরিবারের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সরাসরি জবাব দিতে তাদের খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, এটি রাজনৈতিক কৌশল। বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের কোনো নেতার বক্তব্যের সরাসরি জবাব না দিয়ে বিএনপি নেতারা হয়তো সাংগঠনিকভাবে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তবে অন্য একটি মত হলো, দীর্ঘদিন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শামীম ওসমান ও তার পরিবারের যে ব্যাপক প্রভাব ছিল, তার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এখনো বিএনপির কিছু নেতার মধ্যে কাজ করতে পারে।

দীর্ঘ সময় ধরে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতি ছিল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিভক্ত। সেই সময়ে শামীম ওসমান ছিলেন আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা। তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেওয়া অনেকের জন্যই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত ঝুঁকির বিষয় ছিল। এখন প্রশ্ন হলো—ক্ষমতার পালাবদলের পরও সেই ভয় কি পুরোপুরি কাটেনি?

শামীম ওসমানের বক্তব্যের জবাবে টিপুর প্রকাশ্য অবস্থানকে ঘিরে বিএনপির ভেতরেও আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বক্তব্যের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে টিপু যে অবস্থান নিয়েছেন, সেটি বিএনপির অন্য নেতাদেরও স্পষ্ট অবস্থান নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। অন্যদিকে, টিপুকে লক্ষ্য করে হুমকি আসার পর বিএনপির অন্য নেতাদের নীরবতা নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

একজন নেতা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দেওয়ার কারণে হুমকির মুখে পড়লে দলের অন্য নেতারা তার পাশে প্রকাশ্যে দাঁড়াচ্ছেন না কেন—এ প্রশ্নও উঠছে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—বিএনপি নেতাদের এই নীরবতা কি ভয়ের কারণে, নাকি এটি সচেতন রাজনৈতিক কৌশল?

অবশ্য কোনো নেতার বক্তব্যের জবাব না দেওয়া মানেই ভয় পাওয়া নয়। অনেক সময় রাজনৈতিক দল পরিস্থিতি বিবেচনা করে প্রতিক্রিয়া জানানোর সিদ্ধান্ত নেয়। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে কোনো নেতার বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে অন্য নেতারা যদি প্রকাশ্যে অনীহা দেখান, তাহলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভিন্ন বার্তা যেতে পারে।

বিশেষ করে টিপুর বিরুদ্ধে হুমকির অভিযোগ ওঠার পর এই প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।

৫ আগস্টের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে গেছে। একসময় যারা ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন দেশের বাইরে কিংবা আত্মগোপনে। বিপরীতে বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রকাশ্যে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। কিন্তু শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং তার জবাবকে কেন্দ্র করে যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে বোঝা যাচ্ছে—নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে অতীতের প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি।

এখন দেখার বিষয়, বিএনপির অন্য শীর্ষ নেতারা কি শামীম ওসমানের বক্তব্যের রাজনৈতিক জবাব দেবেন, নাকি টিপুকেই এই লড়াইয়ে একা থাকতে হবে।

আর সেই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—একমাত্র টিপু ছাড়া আর কেউ কেন শামীম ওসমানের বক্তব্যের জবাব দিচ্ছেন না? অন্য বিএনপি নেতারা কি সত্যিই শামীম ওসমানকে এখনো ভয় পান, নাকি এর পেছনে রয়েছে অন্য কোনো রাজনৈতিক হিসাব?