গার্ডিয়ানের নিবন্ধন :
কয়েক দিন ধরে আমি পররাষ্ট্রনীতি বিশেষজ্ঞ, বিশ্লেষক এবং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলেছি- ডনাল্ড ট্রাম্পের ইরান সম্পর্কিত প্রকৃত লক্ষ্য কী এবং কীভাবে বোঝা যাবে যে তিনি সেই লক্ষ্য অর্জন করেছেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন বলেছেন, ট্রাম্প এমন ধরনের ‘যুদ্ধ’ চান যেটা যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলায় করেছিল। সেখানে বিশেষ বাহিনীর মাধ্যমে দেশটির নেতাকে অপহরণ করা হয় বা যেমন জুন মাসে হয়েছে, ইরানে যেখানে পারমাণবিক বোমা তৈরির সম্ভাবনা ছিল বলে মনে করা হয়, সেখানে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত বিমান হামলা চালানো হয়। তাদের মতে, আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প এখন দাবি করতে পারেন যে তার শাসন পরিবর্তন লক্ষ্য পূরণ হয়েছে। সুতরাং যত দ্রুত সম্ভব- মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা বাড়ার আগে এবং তেলের দাম বেড়ে সাধারণ মানুষের ওপর প্রভাব পড়ার আগে, তিনি ইরানের ওপর হামলাকে সফল ঘোষণা করবেন এবং বলবেন যে এখন বিষয়টি আবার আলোচনার টেবিলে ফিরছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এরপর ট্রাম্প আশা করবেন ইরান তার দাবিগুলো মেনে নেবে। এর মধ্যে রয়েছে, অস্ত্র তৈরির পর্যায়ে প্লুটোনিয়াম উৎপাদন বন্ধ করা। পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করা। সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা। তাদের মিত্র বা প্রক্সি শক্তিগুলোকে নিরস্ত্র করা। এর মধ্যে আছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, হামাস, ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া (যেমন পিএমএফ, কাতিব, হিজবুল্লাহ), ইয়েমেনের হুতি এবং সিরিয়ার সংশ্লিষ্ট বাহিনী। আরও কিছু বিশেষজ্ঞ বলেছেন, এই সংঘাতে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে মার্কিন সংবাদমাধ্যমে যেভাবে দেখানো হচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বড় ভূমিকা পালন করছেন। নেতানিয়াহু ইরানের সব ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা ধ্বংস করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যার জন্য আরও ব্যাপক এবং হয়তো মাসের পর মাস চলতে পারে এমন বোমাবর্ষণ দরকার হবে।
ট্রাম্প চান না যে নেতানিয়াহু তাকে ছাপিয়ে যান বা বিশ্বকে বলেন যে, ইরানের হুমকি দূর করতে আরও পদক্ষেপ দরকার। তাই বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা চালিয়ে যাবেন যতক্ষণ না নেতানিয়াহু বোমাবর্ষণ বন্ধে সম্মত হন। আরও কয়েকজন মনে করেন, ট্রাম্প এখনও ভেনেজুয়েলায় যে লক্ষ্য অর্জন করেছিলেন বলে বিশ্বাস করেন সেটাই চান- একটি অনুগত বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য সরকার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি চান ইতিহাস তাকে সেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনে রাখুক যিনি ইরানের হুমকি স্থায়ীভাবে শেষ করেছেন এবং তিনি বিশ্বাস করেন তিনি সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করতে পারবেন।
এ পর্যন্ত কোনো মার্কিন সেনা ইরানের মাটিতে নামেনি। কিন্তু যদি ট্রাম্প স্থায়ী ‘শাসন পরিবর্তন’ চান, তাহলে প্রায় নিশ্চিতভাবেই স্থলবাহিনী লাগবে। ইরানের সেনাবাহিনীতে প্রায় দশ লাখ সেনা আছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টারা ইরানের সেনাবাহিনী ও রেভল্যুশনারি গার্ডের শক্তি ও দৃঢ়তাকে কম করে দেখছেন। ট্রাম্প ও তার আশপাশের লোকজন মনে করেন তারা ইরানে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে পারবেন, যেখানে মার্কিন সেনারা শুধু পরামর্শক হিসেবে থাকবে। কিন্তু অনেকের মতে এটি এক ধরনের ভ্রান্ত ধারণা (ভিয়েতনাম যুদ্ধের কথা কি মনে আছে?)।
এছাড়াও ইরানে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনাও রয়েছে।
আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তাদের বেশিরভাগই মনে করেন ট্রাম্পের কোনো পরিষ্কার কৌশল নেই। তারা বলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই পরিস্থিতির জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নন। আর পেন্টাগন, স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং জাতীয় নিরাপত্তা টিমের মধ্যে বিশৃঙ্খলা চলছে। কার্যত কেউই পুরো পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণে নেই।
ট্রাম্প মনে করেন তিনি এটি সামলে নিতে পারবেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন তিনি সবার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান। কিন্তু বাস্তবে তিনি চলমান কৌশল ও পদক্ষেপ নিয়ে পরস্পরবিরোধী পরামর্শ পাচ্ছেন এবং কখনো কখনো পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে সবচেয়ে পরিষ্কার ধারণা আছে শুধু জেনারেল ও পেন্টাগনের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তাদের, যারা ইরান থেকে তাৎক্ষণিক তথ্য পাচ্ছেন। কিন্তু তাদেরও কোনো ‘এক্সিট স্ট্র্যাটেজি’ নেই। কারণ তারা মনে করেন যুদ্ধ কখন সফল হয়েছে বা ‘সাফল্য’ বলতে কী বোঝায়- এটা নির্ধারণ করা তাদের কাজ নয়। তবে তারা উদ্বিগ্ন যে এই সংঘাত যুক্তরাষ্ট্রের এমন সম্পদ খরচ করে ফেলতে পারে যা বিশ্বের অন্য সম্ভাব্য সংঘাত মোকাবিলায় দরকার হতে পারে।
আমি যাদের সঙ্গে কথা বলেছি তারা বারবার বলেছেন, এটি এমন একটি যুদ্ধ যার কোনো স্পষ্ট পরিকল্পনা নেই, কোনো সুস্পষ্ট কৌশল নেই এবং এটি কোথায় গিয়ে শেষ হবে সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণাও নেই।
(লেখক মার্কিন সাবেক শ্রমমন্ত্রী এবং ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির পাবলিক পলিসির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক)




