সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য পদে আলোচনায় বিভা হাসান

35

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে দেশজুড়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জেও সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে নানা মহলে চলছে আলোচনা। সেই আলোচনায় বারবারই উঠে আসছে সাবেক প্যানেল মেয়র ও দুই বারের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর আফসানা আফরোজ বিভা হাসানের নাম। স্থানীয় রাজনীতি, সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং করোনাকালে মানবিক উদ্যোগের কারণে ইতোমধ্যেই তিনি নারায়ণগঞ্জের পরিচিত মুখ।

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসন রয়েছে ৫০টি। প্রতি ছয়জন সাধারণ সংসদ সদস্যের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করা হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এককভাবে ২০৯টি আসনে জয়লাভ করে। এর ফলে দলটি সংরক্ষিত নারী আসনে ৩৫টি আসন পেতে যাচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলায় পাঁচটি সংসদীয় আসন থাকলেও সংরক্ষিত নারী আসনের ক্ষেত্রে অনেক সময় মুন্সিগঞ্জ জেলার সঙ্গে আসনটি সমন্বয় করা হয়। ফলে অতীতে বেশ কয়েকবার মুন্সিগঞ্জ থেকে প্রতিনিধিত্ব হয়েছে। তবে এবারের নির্বাচনে জেলার চারটি আসনে বিএনপি প্রার্থীদের জয় পাওয়ায় সংরক্ষিত আসনটি নারায়ণগঞ্জে আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় সরকার পর্যায়ে আফসানা আফরোজ বিভা হাসানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর হিসেবে। ২০১৭ সাল থেকে টানা দুই দফায় তিনি ১৬, ১৭ ও ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত আসনে নির্বাচিত হন। দায়িত্ব পালনকালে এক দফায় অতিরিক্ত প্যানেল মেয়র হিসেবেও নির্বাচিত হন তিনি। বিভিন্ন সময় মেয়র অনুপস্থিত থাকলে তিনি দক্ষতার সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত মেয়রের দায়িত্বও পালন করেছেন।

জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি বিগত সময়ে তাকে সামাজিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। কাউন্সিলর হিসেবে পাওয়া বেতনের টাকায় ওয়ার্ডবাসীদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন। ঈদ, পূজা ও বিভিন্ন উপলক্ষে সাধারণ মানুষের মাঝে খাদ্যসামগ্রী সহায়তা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, চক্ষু চিকিৎসা ও অপারেশন, হতদরিদ্র শিশুদের সুন্নতে খতনা এবং ওষুধ বিতরণ করেছেন এবং নিয়মিত করে যাচ্ছেন। এছাড়া সব সময় সামাজিক কার্যক্রমেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। তরুণ সমাজের জন্য বিভিন্ন খেলা, টুর্নামেন্টের আয়োজন এবং খেলার মাঠ সংরক্ষণ আন্দোলন করেছেন। বর্তমানেও বাবুলাইল মাঠটি রক্ষায় আন্দোলন করে যাচ্ছেন তিনি।

বিভা হাসান নারায়ণগঞ্জে করোনাকালীন সময়েও মানবিক ভূমিকার জন্য আলোচিত ছিলেন। ২০২০ সালে নারায়ণগঞ্জ করোনার এপিসেন্টারে পরিণত হয়। এ জেলায় প্রথম করোনা আক্রান্ত শনাক্ত ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। সংক্রমণ রোধে নারায়ণগঞ্জে প্রথম লকডাউন ঘোষণা করা হয়। পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়া লকডাউন ঘোষণার কারণে বিপাকে পড়ে নিম্ন আয়ের মানুষ। অনাহারে দিন কাটতে থাকে অনেকের। সে সময় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী এসব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে নিয়মিত খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছেন তিনি।

সে সময় দেওভোগের বাসিন্দা ও জনপ্রিয় গিটারিস্ট ফখরুল আলম ওরফে ‘হিরো লিসান’ করোনা উপসর্গ নিয়ে বাড়ির সামনে অ্যাম্বুলেন্সেই মারা যান। টানা ৯ ঘণ্টা লাশ বাড়ির সামনে পড়ে থাকলেও পরিবার-স্বজন বা কেউ এগিয়ে আসেনি। হৃদয়বিদারক সেই ঘটনায় তখন এগিয়ে এসেছিলেন কাউন্সিলর আফসানা আফরোজ বিভা। নিজের স্বেচ্ছাসেবী দল নিয়ে মৃতের দাফন সম্পন্ন করেন। পুরো করোনাকালীন সময়ে এমন শতাধিক মানুষের দাফনের ব্যবস্থা করেছেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তার পাশাপাশি নিজ উদ্যোগে নিয়মিত খাদ্য, স্বাস্থ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিতরণ করে মানুষের পাশে ছিলেন।

আফসানা আফরোজ বিভা ব্যক্তিগতভাবে সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও তিনি নারায়ণগঞ্জের একটি সুপরিচিত বিএনপি ঘরানার রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তার স্বামী হাসান আহমেদ মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক। তার ভাসুর ও চাচাতো ভাই এমএ মজিদ নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এবং একজন প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। ফলে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলেও তার পরিচিতি রয়েছে।

বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ শহরের ‘ফুসফুস’ হিসেবে পরিচিত ‘সিটি পার্ক’ নির্মাণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিলেন বিভা হাসান। পার্কটি রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের একটি জমিতে স্থাপিত। পার্ক নির্মাণের আগে জায়গাটি ‘রেলওয়ে কলোনি বস্তি’ নামে পরিচিত ছিল, যা দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাস ও মাদকের আড্ডাখানা হিসেবে পরিচিত ছিল। পার্ক নির্মাণের জন্য বস্তি উচ্ছেদ করা তৎকালীন নাসিক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর একার পক্ষে সহজ ছিল না। সে সময় বিভা হাসান তার রাজনৈতিক ও পারিবারিক পরিচিতির মাধ্যমে বিষয়টি এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন। উচ্ছেদের পরও পার্ক নির্মাণে ভূমিকা রাখেন তিনি। একইভাবে জল্লারপাড় পার্ক নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তার এই অবদানের জন্য স্থানীয়রা এখনো তার প্রতি কৃতজ্ঞ এবং তাকে সম্মান করেন।

বিগত সময়ে আফসানা আফরোজ বিভার এসব সামাজিক ও জনকল্যাণমূলক কাজের কারণে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে তার একটি আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, মাঠপর্যায়ে কাজের অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডের কারণে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য পদ নিয়ে আলোচনায় তার নামটি গুরুত্ব পাচ্ছে। সুযোগ পেলে তিনি দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে পারবেন। এছাড়া বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশও তাকে এই পদে দেখতে চায়।