নিজস্ব প্রতিবেদক :
দেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে ‘এক-এগারো’ ও ‘ডিপ স্টেট’ প্রসঙ্গ। রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন প্রশ্ন উঠছে—২০০৭ সালের মতো কোনো অস্বাভাবিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা হলে তার সুযোগ কে নেবে এবং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কারা?
একজন প্রবাসী সাংবাদিক সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। যদিও এসব দাবির স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই, তবু অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে বিষয়টি একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকেই।
২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি বড় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। সে সময় তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত, নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং সহিংস পরিস্থিতির মধ্যে জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনাবাহিনী-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে। পরবর্তী সময়ে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কারের নামে ‘মাইনাস টু’ ধারণা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ২০০৭ সালের ঘটনাকে সরাসরি এক করে দেখা অবশ্যই ঠিক হবে না। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংঘাত যত বাড়বে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর আস্থার সংকট যত গভীর হবে, ততই অরাজনৈতিক শক্তির হস্তক্ষেপের আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি এখানেই। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, তার অন্যতম প্রধান দাবির মধ্যে ছিল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, জবাবদিহি এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। দুই বছর পর সেই আন্দোলনের উত্তরাধিকার নিয়েই এখন বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য তীব্র হচ্ছে।
বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে এনসিপির সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতিকে আরও স্পর্শকাতর করে তুলেছে। গত ১৮ সেপ্টেম্বর এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারকে কঠোরভাবে সমালোচনা করে তাকে ‘নতুন কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং সরকার মতপ্রকাশ ও মানবাধিকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেন। সরকারবিরোধী অবস্থানের অংশ হিসেবে এনসিপি সাইবার আইন, গুমবিরোধী আইন ও বিশেষ রেসপন্স ব্যাটালিয়ন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে আন্দোলনের কর্মসূচি পালন করছে। জোটটির নেতারা জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তৈরি হওয়া সংস্কার-প্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কার নিয়েও বিএনপি এবং বিরোধী জোটগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে।
ফলে যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো ২০২৪ সালের আন্দোলনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রধান অংশীদার হয়ে উঠেছিল, তাদের মধ্যেই এখন দূরত্ব বাড়ছে। এই বিভাজন যত তীব্র হবে, ততই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা বাড়বে—আর সেখানেই ‘তৃতীয় শক্তি’ বা কথিত ‘ডিপ স্টেট’-এর ভূমিকা নিয়ে জল্পনা আরও জোরালো হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক সংঘাতের কোনো পক্ষই যেন নিজেদের পারস্পরিক বিরোধকে এমন পর্যায়ে নিয়ে না যায়, যেখানে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার জায়গা সংকুচিত হয়ে পড়ে। কারণ অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করলে তার প্রভাব শেষ পর্যন্ত পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার ওপর পড়ে।
আর সেই পরিস্থিতির সম্ভাব্য সুবিধাভোগী হিসেবে আলোচনায় আসছে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে নিষিদ্ধ এবং এর অধিকাংশ শীর্ষ নেতা-নেত্রী দেশের বাইরে বা আত্মগোপনে রয়েছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দলটির পক্ষ থেকে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং বিচ্ছিন্ন কর্মসূচির খবরও এসেছে।
অতএব বিএনপি সরকার, এনসিপি, জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তারা কি নিজেদের রাজনৈতিক বিরোধ সংসদ, সংলাপ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে পারবে, নাকি পারস্পরিক সংঘাত এমন পর্যায়ে যাবে যেখানে অন্য কোনো শক্তি পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ পাবে?
একটি বিষয় অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন—‘ডিপ স্টেট’ কারা, তারা আদৌ কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়ে সক্রিয় কি না, কিংবা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে কি না—এসব বিষয়ে প্রকাশ্য ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিবেশ তৈরি হলে যে অনিশ্চয়তা ও ষড়যন্ত্রের জল্পনা বাড়ে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস তার উদাহরণ দিয়েছে।
সুতরাং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুধু সরকারের নয়, বিরোধী দলগুলোরও। জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছিল, সেটি যদি দলীয় সংঘাত ও পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতিতে আটকে যায়, তাহলে সেই আন্দোলনের মূল প্রত্যাশা—একটি জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা—প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
আর সেখানেই হয়তো লুকিয়ে আছে বর্তমান রাজনীতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি।




