আমজাত হোসেন :
ফতুল্লা থানা বিএনপির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলাম। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি এলাকায় একজন ভদ্র, সজ্জন ও আপাদমস্তক দলনিষ্ঠ নেতা হিসেবে পরিচিত। বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকার পরও জীবনের এই পর্যায়ে এসে কেন তিনি যথাযথ মূল্যায়ন পেলেন না—এ প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে তার নিজ এলাকা ফতুল্লার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে।
স্থানীয়দের একটি অংশের মতে, মনিরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল দলীয় রাজনীতির চেয়ে ব্যক্তির প্রতি আনুগত্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। আর সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্যই এখন তাকে দিতে হচ্ছে বলে মনে করছেন তারা।
২০০১ সালে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সংসদ সদস্য আলহাজ্ব মুহম্মদ গিয়াস উদ্দিনের সহযোগিতায় মনিরুল ইসলাম ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি হন—এমনটাই স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত। সেই সময় থেকে গিয়াস উদ্দিনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দীর্ঘদিনের সেই সম্পর্ক ও কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই পরবর্তী সময়েও তিনি গিয়াস উদ্দিনের পাশে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছিলেন বলে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি।
বিশেষ করে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের সময় গিয়াস উদ্দিনের পক্ষে মনিরুল ইসলামের মাঠে সক্রিয় থাকার বিষয়টি বিএনপির অভ্যন্তরে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়েছিল বলে দলীয় একাধিক সূত্রের দাবি। নির্বাচনে গিয়াস উদ্দিন পরাজিত হওয়ার পর রাজনৈতিকভাবে মনিরুল ইসলামও অনেকটা আড়ালে চলে যান। এরপর থেকে বিএনপির রাজনীতিতে তার দৃশ্যমান ভূমিকা ক্রমেই কমে আসে।
স্থানীয় বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত কয়েকজনের মতে, এটি অনেকটা ‘ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে রাজনীতি করার’ পরিণতি। তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক বাস্তবতায় কোনো নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক থাকা স্বাভাবিক; কিন্তু দলীয় সিদ্ধান্ত ও দলীয় স্বার্থের সঙ্গে ব্যক্তিগত আনুগত্যের সংঘাত তৈরি হলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা নেতাকেই বহন করতে হয়।
অবশ্য মনিরুল ইসলামের রাজনৈতিক অতীতও কম সমৃদ্ধ নয়। একসময় তিনি প্রয়াত সংসদ সদস্য কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম এবং জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে তৈমুর আলম খন্দকারের সঙ্গে তার রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। কিন্তু পরবর্তীতে তৈমুর আলম খন্দকার বিএনপি থেকে সরে গিয়ে তৃণমূল বিএনপি গঠন করলে সেই রাজনৈতিক বলয়েরও কার্যত অবসান ঘটে।
ফলে একসময় বিএনপির রাজনীতিতে যেসব প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে মনিরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা ছিল, সময়ের পরিক্রমায় তাদের কেউ রাজনীতির বাইরে, কেউ দলীয়ভাবে দূরে, আবার কেউ ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থানে চলে গেছেন। আর এর ফলে বিএনপির বর্তমান মূলধারায় মনিরুল ইসলামের রাজনৈতিক আশ্রয় বা শক্তিশালী শুভাকাঙ্ক্ষীর সংখ্যা কমে গেছে বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ।
এরই মধ্যে সম্প্রতি কাশীপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সভাপতি মঈনুল ইসলাম রতন এক ফেসবুক পোস্টে অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলাম অসুস্থ থাকার কথা জানিয়েছেন। বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন এমন বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই তার রাজনৈতিক অবস্থান ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা করছেন।
তাদের কেউ কেউ মনে করছেন, মনিরুল ইসলামের বর্তমান অবস্থার পেছনে শুধু বয়স, অসুস্থতা কিংবা সাংগঠনিক বাস্তবতা নয়, অতীতের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তাদের মতে, রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূলধারার দলীয় রাজনীতির বাইরে গিয়ে কোনো অবস্থান নেওয়া দীর্ঘমেয়াদে একজন নেতাকে একাকী করে দিতে পারে।
তবে মনিরুল ইসলামের ঘনিষ্ঠদের বক্তব্য, তাকে ‘দলবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা যথাযথ নয়। বরং দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি দলের জন্য কাজ করেছেন এবং যাদের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তাদের প্রতি ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা ও কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই তিনি বিভিন্ন সময়ে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, এটিকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তারপরও ফতুল্লার রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—দলের চেয়ে ব্যক্তিকে প্রাধান্য দেওয়ার রাজনীতি কি শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলামের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারকে পিছিয়ে দিয়েছে?
যে নেতা একসময় ফতুল্লা থানা বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন, দলের একাধিক প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং মাঠের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় ছিলেন, সেই নেতার আজকের নীরবতা তাই অনেকের কাছেই কেবল একজন ব্যক্তির রাজনৈতিক পতন নয়; বরং বাংলাদেশের স্থানীয় দলীয় রাজনীতিতে ব্যক্তি-নির্ভরতার ঝুঁকিরও একটি উদাহরণ।
ফতুল্লার রাজনৈতিক মহলের অনেকেরই এখন উপলব্ধি—রাজনীতিতে ব্যক্তিগত আনুগত্যের মূল্য থাকতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে দলীয় মূলধারার সঙ্গে সম্পর্কই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। মনিরুল ইসলামের রাজনৈতিক জীবন সেই বাস্তবতারই একটি আলোচিত দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।




