বর্ষার আগেই উদ্যোগ, তবু জলাবদ্ধতার আতঙ্কে ফতুল্লাবাসী

13

নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রতি বছর বর্ষা এলেই নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা পরিণত হয় এক ধরনের স্থায়ী জলাবদ্ধতার জনপদে। টানা চার থেকে পাঁচ মাস পানির নিচে ডুবে থাকা এই জনপদে মানুষের জীবন হয়ে ওঠে প্রায় অচল। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এনায়েতনগর ইউনিয়নের উত্তর মাসদাইর গাবতলী এলাকা এবং ফতুল্লা ইউনিয়নের ইসদাইর, লালপুর, সস্তাপুরসহ আশপাশের নিম্নাঞ্চলগুলো।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকায় জলাবদ্ধতা এমন ভয়াবহ রূপ নেয় যে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেন না। অনেক পরিবারকে ঘরের ভেতরেই অস্থায়ী বাঁশের মাচা তৈরি করে বসবাস করতে হয়। রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ-মাদ্রাসা সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায় এবং কর্মজীবী মানুষের আয়-রোজগার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, এটি প্রাকৃতিক জলাবদ্ধতা নয়, বরং দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-ড্রেন দখল ও অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার ফলেই তৈরি হয়েছে কৃত্রিম বন্যা পরিস্থিতি। তারা অভিযোগ করেন, বছরের পর বছর একই দুর্ভোগ পোহালেও টেকসই কোনো সমাধান চোখে পড়েনি।
তবে এবার কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বর্ষা শুরুর আগেই জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ আগেভাগেই খাল খনন কার্যক্রম শুরু করেছেন, যা স্থানীয়দের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার করেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক রায়হার কবীর জানিয়েছেন, দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে এ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এই বরাদ্দের আওতায় খাল পুনঃখনন, পানি নিষ্কাশন পথ প্রশস্তকরণ, ড্রেনেজ সংস্কার এবং জলাবদ্ধতা প্রবণ এলাকাগুলোতে দ্রুত পানি অপসারণের ব্যবস্থা গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু এলাকায় প্রাথমিক কাজ শুরু হয়েছে বলেও জানা গেছে।
তবে আশার পাশাপাশি শঙ্কাও কাটেনি এলাকাবাসীর। গত এক যুগ ধরে একই দুর্ভোগে পড়ায় সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে তারা সন্দিহান। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, যথাযথ তদারকি না থাকলে বরাদ্দকৃত অর্থের অপচয় বা তছরুপ হতে পারে, যা আগের মতোই সমস্যাকে জিইয়ে রাখবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয় এর সঠিক বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তারা জেলা পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন, যেন প্রতিটি কাজ স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন হয় এবং জনগণ এর সুফল পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফতুল্লার জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান, খাল-নদী দখলমুক্ত রাখা, এবং নগর পরিকল্পনার সঙ্গে পানি ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করা। তা না হলে প্রতি বছরই একই চক্রে ঘুরপাক খাবে এই জনপদ।
সব মিলিয়ে, আগাম উদ্যোগ ও সরকারি বরাদ্দে আশার আলো দেখা গেলেও বাস্তবতা নির্ভর করছে কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ফতুল্লাবাসীর প্রত্যাশা এবার যেন শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, বাস্তব পরিবর্তন দেখতে পান তারা। ##