চেম্বর ও বিকেএমইএ,র পর এবার টার্গেট এলিটদের এই ক্লাব...

নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নির্বাচনকে সামনে রেখে এক আওয়ামী ব্যবসায়ীর তৎপরতা

1105

আমজাদ হোসেন :

নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী ও সামাজিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তারকারী এক ব্যবসায়ীকে ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, সাবেক ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ বলয়ে অবস্থানকারী এই ব্যবসায়ী এবার রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজের অবস্থানও পাল্টে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, অতীতে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ থেকে যেভাবে ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, এখন সেই পুরনো নেটওয়ার্ককেই নতুন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন তিনি।

নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহলের একাধিক সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ সময় ধরে ওই ব্যবসায়ীকে ওসমান পরিবারের প্রভাবশালী নেতাদের পাশে ছায়ার মতো দেখা গেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী অঙ্গনের গুরুত্বপূর্ণ দুটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন—বিকেএমইএ এবং নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে তার ব্যাপক প্রভাব ছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তার প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

ফতুল্লার শাসনগাঁও এলাকায় ওই ব্যবসায়ীর একটি গার্মেন্ট কারখানা রয়েছে। ব্যবসা ও সংগঠনভিত্তিক প্রভাবের কারণে দীর্ঘদিন তিনি নারায়ণগঞ্জের শিল্প ও ব্যবসায়ী মহলে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছিলেন বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। কিন্তু ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তার অবস্থানও হঠাৎ করেই প্রশ্নের মুখে পড়ে। সূত্রগুলোর দাবি, ওই সময় তিনি কয়েকদিন অনেকটা আড়ালে চলে যান। তার রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা আলোচনা শুরু হয়।

তবে পরিস্থিতি খুব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিএনপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একজন প্রভাবশালী শিল্পপতি এবং বর্তমানে দায়িত্বে থাকা একজন সংসদ সদস্যের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করে তিনি আবারও নিজের অবস্থান শক্ত করতে সক্ষম হন। এরপর ধীরে ধীরে তিনি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে বিভিন্ন মহলে যোগাযোগ বাড়াতে থাকেন।

অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে তিনি বিএনপি-জামায়াত ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন। একই সঙ্গে ব্যবসায়ী সংগঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদেও তিনি অবস্থান করছেন। ফলে ৫ আগস্টের পর যাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল, তাদের মধ্যে অনেকেই যখন নিজেদের প্রভাব হারিয়েছেন, তখন এই ব্যবসায়ী কীভাবে নিজের অবস্থান ধরে রাখলেন—তা নিয়েও নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়ী মহলে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

বিকেএমইএর বর্তমান সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম হলেও সংগঠনটির অভ্যন্তরে ওই ব্যবসায়ীর প্রভাব এখনও যথেষ্ট রয়েছে বলে দাবি করছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাদের মতে, মোহাম্মদ হাতেমের দৃঢ় অবস্থানের কারণে তিনি বিকেএমইএর ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। তবে সংগঠনের বিভিন্ন স্তরে তার প্রভাব ও ঘনিষ্ঠদের অবস্থান এখনও বেশ শক্তিশালী বলে তাদের দাবি। এ কারণে বিকেএমইএতে তার প্রভাব পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।

নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিতেও তার প্রভাব রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ী মহলের একটি অংশের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনে যে প্রভাববলয় তৈরি হয়েছিল, রাজনৈতিক সরকার পরিবর্তনের পরও সেই বলয়ের অনেকেই নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন। ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র বদলালেও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর ভেতরে পুরনো প্রভাব পুরোপুরি ভাঙেনি।

এমন পরিস্থিতিতে ওই ব্যবসায়ী এবার নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের দিকে নজর দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নারায়ণগঞ্জের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই ক্লাবের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে ইতোমধ্যেই বিভিন্ন মহলে তৎপরতা শুরু হয়েছে। আর এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ওই ব্যবসায়ী নিজের পছন্দের একজন প্রার্থীকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করছেন বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

সূত্রগুলোর দাবি, ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তির সঙ্গেও তিনি যোগাযোগ করছেন। তার লক্ষ্য হচ্ছে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে বিজয়ী করে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী প্রভাববলয় তৈরি করা। আর সেটি সম্ভব হলে ক্লাবের ওপর তার প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ।

ব্যবসায়ী মহলের কয়েকজনের মতে, বিষয়টি শুধু একটি ক্লাবের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের পরিকল্পনা থাকতে পারে। কারণ ইতোমধ্যে বিকেএমইএ ও চেম্বার অব কমার্সে তার অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। এখন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবেও নিজের পছন্দের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারলে শহরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হবে।

এ নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও নানা আলোচনা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করছেন, সাবেক ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ীদের একটি অংশ রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের পর নিজেদের পুরনো অবস্থান ধরে রাখতে নতুন রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছেন। ওই ব্যবসায়ীও একই কৌশল অনুসরণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করে তিনি পুরনো প্রভাববলয়কে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছেন কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তন করলেই তার অতীতের ভূমিকা মুছে যায় না। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ থেকে যারা বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে প্রভাব বিস্তার করেছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাদের ভূমিকা নতুন করে যাচাই করা প্রয়োজন। কারণ রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র পরিবর্তিত হলেও ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, সাংগঠনিক যোগাযোগ এবং প্রভাববলয় অনেক সময় অক্ষুণ্ণ থাকে।

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, ওই ব্যবসায়ী শুধু নিজের ব্যবসা কিংবা ব্যবসায়ী সংগঠনের অবস্থান ধরে রাখতে চান না; বরং শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। এ ক্ষেত্রে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব তার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের আশঙ্কা, নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নেতৃত্বে তার পছন্দের ব্যক্তি প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতে ক্লাবের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে ওই ব্যবসায়ীর প্রভাব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে তার পুরনো রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কও নতুন করে শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পাবে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের বিএনপি ও জামায়াতের নেতাদের একটি অংশের মধ্যেও এ নিয়ে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, শুধু বর্তমান রাজনৈতিক পরিচয় দেখে কোনো ব্যবসায়ী বা প্রভাবশালী ব্যক্তিকে গ্রহণ করার আগে তার অতীত ভূমিকা, ব্যবসায়ী সংগঠনে অবস্থান এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের ইতিহাস বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তা না হলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পুরনো ক্ষমতাবলয় নতুন মুখ ও নতুন পরিচয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

তবে ওই ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তিনি যদি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেন বা তার পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়, তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।

সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে এখন যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে তা হলো—এটি কি কেবল একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক নির্বাচন, নাকি এর আড়ালে শহরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তারের নতুন কোনো সমীকরণ তৈরি হচ্ছে?

একদিকে অতীতে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ব্যবসায়ীর বর্তমান তৎপরতা, অন্যদিকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন—দুটিকে পাশাপাশি রেখে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ী মহল এখন বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। শেষ পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নেতৃত্বে কারা আসছেন এবং তাদের পেছনে কার প্রভাব রয়েছে, সেটিই হয়তো স্পষ্ট করে দেবে শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানটি সত্যিই কতটা প্রভাবমুক্ত থাকতে পারছে।