নভেম্বরে আবার দলীয় সরকারের অধীনে গণতন্ত্রের পরীক্ষা

নভেম্বরে ইউপি ভোট: এবার ‘মাই ম্যান’ বসানোর দিন শেষ?

7

 রফিকুল ইসলাম জীবন :

নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে আবার শুরু হতে যাচ্ছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নতুন পর্ব। নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যে জানিয়েছে, চলতি বছরের নভেম্বরকে সামনে রেখে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারও বলেছেন, সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে তফসিল দিয়ে নভেম্বরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

এই ঘোষণার পরই নারায়ণগঞ্জের ৩৯টি ইউনিয়নে শুরু হয়েছে নির্বাচনী তোড়জোড়। জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ৩৯টি ইউনিয়ন পরিষদ। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মী এবং স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থীরা এরই মধ্যে মাঠ গোছাতে শুরু করেছেন। সম্ভাব্য চেয়ারম্যান ও সদস্য প্রার্থীদের নিয়ে ইউনিয়নগুলোতে শুরু হয়েছে আলোচনা, মতবিনিময় ও গণসংযোগ।

তবে এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে সবচেয়ে বড় আলোচনা হচ্ছে—স্থানীয় সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই স্তরে এবার কি সত্যিই জনগণের ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হবেন, নাকি অতীতের মতো প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের পছন্দের প্রার্থীদের জয় নিশ্চিত করার চেষ্টা হবে?

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক দশকে নারায়ণগঞ্জের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ ছিল রাজনৈতিক প্রভাব, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতাদের পছন্দের প্রার্থীদের আধিপত্য নিয়ে। বিশেষ করে ২০১৬ ও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ঘিরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন ইউনিয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত একাধিক চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার বিষয় উঠে এসেছিল।

শামীম ওসমানের বলয়ে একাধিক চেয়ারম্যান

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি এ কে এম শামীম ওসমানের নির্বাচনী রাজনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন ফতুল্লা এলাকার একাধিক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান—এমন তথ্য বিভিন্ন সময় স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।

কাশীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম সাইফ উল্লাহ বাদল, বক্তাবলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এম শওকত আলী, এনায়েতনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান, ফতুল্লার চেয়ারম্যান স্বপন এবং কুতুবপুরের চেয়ারম্যান মনিরুল আলম সেন্টুর সঙ্গে শামীম ওসমানের রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতার বিষয়টি বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এমনকি ২০২৩ সালের একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির প্রতিবেদনে শামীম ওসমানের সঙ্গে এই পাঁচ চেয়ারম্যানের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়।

এনায়েতনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামানকে ২০২৫ সালে গ্রেপ্তারের সময় একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে তাকে শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।

স্থানীয় বিএনপি ও বিরোধী রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনগুলোতে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ সবসময় নিশ্চিত হয়নি। ফলে অনেক ইউনিয়নে ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত সীমিত হয়ে পড়েছিল।

আড়াইহাজারে নজর ছিল বাবুর প্রভাবের দিকে

নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রভাব ছিল আড়াইহাজারের ইউনিয়ন পর্যায়েও। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের অভিযোগ, তার অনুসারী হিসেবে পরিচিত একাধিক নেতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্য পদে প্রভাব বিস্তার করেছেন। তিনি দশটি ইউনিয়নে তার পছন্দের দশজন চেয়ারম্যান বাসিয়েছেন। তাই এবারের নির্বাচনে মূল প্রশ্ন হচ্ছে—কোনো সংসদ সদস্য বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা স্থানীয় ভোটের ওপর কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন এবং নির্বাচন কমিশন তা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে।

গাজী, কায়সার ও সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধেও ছিল প্রভাবের অভিযোগ

রূপগঞ্জের সাবেক এমপি গাজী গোলাম দস্তগীর, সোনারগাঁয়ের সাবেক এমপি কায়সার হাসনাত এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি সেলিম ওসমানের বিরুদ্ধেও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের নানা অভিযোগ ছিল বলে দাবি স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের। তারাও একই কাজ করেছেন। ‘মাই ম্যান’ বসিয়েছেন।

সাধারন মানুষের পরিসআকর বক্তব্য হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের রাজনীতি, স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্র এবং সংসদ সদস্যদের প্রভাব নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। কোথাও কোথাও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিতে এসব ঘটনাই ‘মাই ম্যান’ সংস্কৃতির অভিযোগকে আরও জোরালো করেছিল।

এবারের চিত্র কি সত্যিই বদলাবে?

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের স্থানীয় রাজনীতির বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে। ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি আসনের চারটিতে বিএনপি এবং একটিতে এনসিপির প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২-এ নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩-এ আজহারুল ইসলাম মান্নান, নারায়ণগঞ্জ-৪-এ আব্দুল্লাহ আল আমিন এবং নারায়ণগঞ্জ-৫-এ আবুল কালাম নির্বাচিত হয়েছেন।

ফলে এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতায়।

নারায়ণগঞ্জের বর্তমান পাঁচ সংসদ সদস্যের মধ্যে চারজন বিএনপির এবং একজন এনসিপির। তাদের প্রত্যেকের নির্বাচনী এলাকার অধীনে রয়েছে একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ। ফলে ইউনিয়ন নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে এমপিদের ভূমিকা।

নজর থাকবে পাঁচ এমপির ওপর

বর্তমান পাঁচ সংসদ সদস্য হলেন—নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের নজরুল ইসলাম আজাদ, নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের আজহারুল ইসলাম মান্নান, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের অ্যাডভোকেট আবুল কালাম। তাদের মধ্যে দিপু, আজাদ ও আব্দুল্লাহ আল আমিনের সংসদীয় দায়িত্বের পাশাপাশি বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় থাকার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

এখন দেখার বিষয়—তারা কি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবেন, নাকি দলীয় প্রভাবের বাইরে থেকে জনগণকে স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ দেবেন?

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে কোনো এমপি যদি প্রকাশ্যে বা গোপনে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ‘মাই ম্যান’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেন, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিতই হবে না; নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে।

বিএনপি-জামায়াত-এনসিপি-স্বতন্ত্রদের লড়াই

এবারের নির্বাচনে বিএনপির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। একই সঙ্গে দলীয় মনোনয়ন না পেলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন অনেকে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও এনসিপির জয় এবং বিভিন্ন আসনে জামায়াতসহ অন্যান্য দলের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ইউনিয়ন পর্যায়ের রাজনীতিতেও নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

ফলে ৩৯ ইউনিয়নের প্রতিটিতেই এবার একাধিক পক্ষের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জনগণের ভোটেই কি হবে চেয়ারম্যান নির্বাচন?

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান-মেম্বাররা সরাসরি জনগণের সঙ্গে যুক্ত জনপ্রতিনিধি। জন্মনিবন্ধন থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা, রাস্তা-ঘাট, পানি নিষ্কাশন, উন্নয়ন প্রকল্পসহ নাগরিক জীবনের বহু বিষয়ে তাদের ভূমিকা রয়েছে।

এ কারণে স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা—এবার কোনো রাজনৈতিক প্রভাব নয়, ভোটের মাঠে জনগণের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে ইতোমধ্যে ‘স্থানীয় সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রকাশ করা হয়েছে।

অতীতের বিতর্ক পেছনে ফেলে এবার যদি নির্বাচন কমিশন মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে, তাহলে নারায়ণগঞ্জের ৩৯ ইউনিয়নে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তবে শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে ক্ষমতাসীন বা প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রভাবমুক্ত রাখা। কারণ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকারের ভোটেই পরীক্ষা হবে—নারায়ণগঞ্জের ইউনিয়নগুলোতে সত্যিই কি ‘মাই ম্যান’ রাজনীতির অবসান ঘটছে, নাকি পুরনো সংস্কৃতি নতুন চেহারায় ফিরে আসছে?

নভেম্বরের ইউপি নির্বাচন তাই শুধু চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচনের লড়াই নয়; এটি নারায়ণগঞ্জে স্থানীয় গণতন্ত্রের নতুন পরীক্ষাও।