এবারই সিটি নির্বাচনে ভোট দিতে চান এসব ইউনিয়নের মানুষ

নভেম্বরে ইউপি নির্বাচন: কী হবে নারায়ণগঞ্জ সদরের পাঁচ ইউনিয়নের?

11

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নভেম্বর থেকে সারাদেশে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরুর প্রস্তুতি চলছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় দেশের অন্যান্য ইউনিয়নের মতো নারায়ণগঞ্জের ইউনিয়নগুলোতেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা মাঠে নামতে শুরু করেছেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নকে ঘিরে।

সদরের পাঁচ ইউনিয়ন—কুতুবপুর, ফতুল্লা, এনায়েতনগর, কাশীপুর ও গোগনগর। প্রশাসনিকভাবে এসব ইউনিয়নকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। ফলে নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুরু হলে এই পাঁচ ইউনিয়নে আদৌ নির্বাচন হবে কি না, তা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তৈরি হয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন।

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এক অনুষ্ঠানে পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, যৌক্তিক কারণেই সদর উপজেলার এসব ইউনিয়ন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পথে রয়েছে। প্রশাসনের এই বক্তব্যের পর পাঁচ ইউনিয়নের সাধারণ মানুষের মধ্যে ইউপি নির্বাচন নিয়ে অনাগ্রহ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, যখন তাদের ইউনিয়ন সিটি করপোরেশনের অংশ হওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে, তখন নতুন করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের কোনো যৌক্তিকতা নেই। তারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচনের বদলে সরাসরি নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ভোট দিতে চান।

‘ইউপি নির্বাচন নয়, সিটি নির্বাচন চাই’

কুতুবপুর, ফতুল্লা, এনায়েতনগর, কাশীপুর ও গোগনগরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অধিকাংশের প্রত্যাশা এখন সিটি করপোরেশনকেন্দ্রিক।

তাদের মতে, দীর্ঘদিন ধরেই নারায়ণগঞ্জ শহরের সঙ্গে এসব ইউনিয়নের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড গভীরভাবে সম্পৃক্ত। বিশেষ করে ফতুল্লা, কুতুবপুর, এনায়েতনগর ও কাশীপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা কার্যত নগরায়ণের আওতায় চলে এসেছে। বিপুল জনসংখ্যা, শিল্প-কারখানা, আবাসিক এলাকা এবং শহরমুখী মানুষের জীবনযাত্রার কারণে এসব এলাকাকে ইউনিয়ন পরিষদের পরিবর্তে সিটি করপোরেশনের বৃহত্তর নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার দাবি দীর্ঘদিনের।

স্থানীয়দের প্রশ্ন—একদিকে যদি পাঁচ ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত এগিয়ে যায়, অন্যদিকে সেখানে আবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের প্রয়োজন কী?

ইউএনওর বক্তব্যে নতুন মাত্রা

পাঁচ ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে যে আলোচনা চলছিল, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বক্তব্যে তা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব ইউনিয়নকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেন। তার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—যৌক্তিক কারণেই সদর উপজেলার সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলো সিটি করপোরেশনের আওতায় যাওয়ার প্রক্রিয়ায় রয়েছে।

এ বক্তব্যের পরই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া যদি বাস্তবেই এগিয়ে থাকে, তাহলে নভেম্বরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সঙ্গে এই পাঁচ ইউনিয়নের অবস্থান কী হবে?

নির্বাচন হলে কী হবে?

স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, পাঁচ ইউনিয়নের নির্বাচন নিয়ে এখন কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

প্রথমত, সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নভেম্বরের আগে কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে।

দ্বিতীয়ত, সীমানা নির্ধারণ ও ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাসের কাজ কত দ্রুত সম্পন্ন হবে।

তৃতীয়ত, নির্বাচন কমিশন নতুন করে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সময় এসব ইউনিয়নকে কীভাবে বিবেচনা করবে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—যে ইউনিয়নের জনগণ নিজেদের ভবিষ্যৎ সিটি করপোরেশনের নাগরিক হিসেবে দেখতে চাইছেন, তাদেরকে আবার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচনে ভোট দিতে বাধ্য করা হবে কি না।

রাজনৈতিক সমীকরণেও পরিবর্তন

সদরের পাঁচ ইউনিয়ন শুধু প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নয়, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব এলাকায় বিপুল ভোটার, ঘনবসতি এবং শিল্পাঞ্চল থাকায় জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে এর প্রভাব রয়েছে ব্যাপক।

নভেম্বরের ইউপি নির্বাচন হলে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের অনেকে ইতোমধ্যে গণসংযোগ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

কিন্তু সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি সামনে আসায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের হিসাব-নিকাশও বদলে যাচ্ছে। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া কেউ কেউ এখন সিটি করপোরেশনের সম্ভাব্য ওয়ার্ড কাউন্সিলর কিংবা মেয়র নির্বাচনের দিকে নজর দিতে পারেন।

ফলে পাঁচ ইউনিয়নের ভবিষ্যৎ শুধু প্রশাসনিক নয়, নারায়ণগঞ্জের স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে।

দ্রুত সিদ্ধান্ত চান পাঁচ ইউনিয়নের মানুষ

স্থানীয়দের দাবি, নির্বাচন কমিশন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় করে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হোক। কারণ, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয়ে গেলে প্রার্থীদের মনোনয়ন, প্রচার ও ভোট আয়োজন নিয়ে বিপুল অর্থ ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড শুরু হবে।

এরপর যদি পাঁচ ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তাহলে সেই নির্বাচন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, ‘আমরা এখন ইউনিয়ন পরিষদের ভোট চাই না। আমরা চাই দ্রুত সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্তি এবং এরপর সিটি করপোরেশন নির্বাচন। আমাদের ভোট একবারই হোক, তবে সেটি যেন ভবিষ্যৎ নগর ব্যবস্থার জন্য হয়।’

সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় পাঁচ ইউনিয়ন

নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কুতুবপুর, ফতুল্লা, এনায়েতনগর, কাশীপুর ও গোগনগরের সামনে এখন মূলত দুটি সম্ভাবনা—একদিকে নভেম্বরের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন, অন্যদিকে সিটি করপোরেশনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নগর নির্বাচনের অপেক্ষা।

কোন পথ বেছে নেওয়া হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

তবে একটি বিষয় ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে—এই পাঁচ ইউনিয়নের মানুষ তাদের ভবিষ্যৎ ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে নয়, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বৃহত্তর নগর কাঠামোর মধ্যেই দেখতে চাইছেন।

এখন নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—নভেম্বরে এই পাঁচ ইউনিয়নের মানুষ ব্যালট হাতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান-মেম্বার নির্বাচনে যাবেন, নাকি অপেক্ষা করবেন বহুল প্রত্যাশিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য।

এ বিষয়ে ফতুল্লার স্থায়ী বাসিন্দা নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারন সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জীবন বলেন, আমরা আর পিছিয়ে থাকতে চাই না। যেহেতু প্রশাসন বা সরকার এসব ইউনিয়নকে নাসিকের অন্তর্ভূক্ত করার স্বিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই এখনই অন্তর্ভূক্ত করা হোক। নইলে আরো ৫/৬ বছরের জন্য আমরা পিছিয়ে পড়বো। আমাদের জোরালো দাবি, আমরা যেনো এবারের সিটি নির্বাচনেই ভোট দিতে পারি।

একই রকম প্রতিক্রিয়া ব্যাক্ত করেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সহসভাপতি হাজী মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ। তিনিও বলেন, আমাদের জেলা প্রশাসক এবং ইউএনও মহোদ্বয় বিচক্ষন ব্যাক্তি। তাই তারা আর দেরী না করে এখনই নাসিকের অন্তর্ভূক্ক করার সকল কাজ শেষ করবেন। আমরা আসন্ন সিটি নির্বাচনেই ভোট দিতে চাই। প্রশাসনকে বুঝতে হবে ফতুল্লাকে পিছিয়ে রাখার আর সময় নেই। এমনিতেই ফতুল্লার দশ লাখ মানুষ উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত। আশা করি তারা দায়িত্বশীল আচরন করবেন।