এনায়েতনগরে ক্ষমতার লড়াই: বিএনপির মনোনয়ন ঘিরে বহুমুখী সমীকরণ, মাঠে নতুন-পুরনোর সংঘাত

276

নিজস্ব প্রতিবেদক:
নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের অন্তর্ভুক্ত সদর উপজেলার এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনীতির মাঠে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে উত্তাপ। দীর্ঘ সময় ধরে ভোটাধিকার চর্চা থেকে বঞ্চিত থাকা এই ইউনিয়নের ভোটাররা এবার একটি গ্রহণযোগ্য ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন প্রত্যাশা করায় রাজনৈতিক দলগুলোও কৌশলগত অবস্থান নিতে শুরু করেছে।

সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির ভেতরে একাধিক শক্ত প্রার্থীর উপস্থিতি যেমন প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে, তেমনি তৈরি করেছে জটিল অভ্যন্তরীণ সমীকরণ। অভিজ্ঞতা, জনপ্রিয়তা, ত্যাগ ও পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য—সবকিছু মিলিয়ে এখানে মনোনয়ন পাওয়া মোটেই সহজ নয়।

সাবেক চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান লিটন মাঠপর্যায়ের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকায় একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তুলেছেন। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তার বিরুদ্ধে ‘পরিবর্তনের দাবি’ও কম নয়। নতুন নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অন্যদিকে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম আলমগীর হক নিজেকে ‘বঞ্চিত প্রার্থী’ হিসেবে উপস্থাপন করে সহানুভূতির ভোট টানার কৌশল নিয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ভোট বর্জনের ঘটনা এখন তার রাজনৈতিক মূল পুঁজি। তবে প্রশ্ন উঠছে—শুধু অতীতের ঘটনাকে সামনে এনে কতটা ভোটারকে প্রভাবিত করা সম্ভব?

রোজিনা বেগমের উত্থান এ নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত দিক। করোনা মহামারিতে তার মানবিক ভূমিকা এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক আন্দোলনে সক্রিয়তা তাকে একটি আলাদা অবস্থানে নিয়ে গেছে। বিশেষ করে নারী ভোটার এবং তরুণদের একটি অংশ তার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে। তবে অতীত নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ এবং মাঠপর্যায়ে শক্ত সংগঠন গড়ে তোলার সীমাবদ্ধতা তার জন্য বড় বাধা হতে পারে।

সহিদুল হক সহিদ মূলত ‘গ্রাসরুটস’ রাজনীতির প্রতিনিধি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। জলাবদ্ধতায় দীর্ঘদিন ভোগা ইসদাইর-গাবতলী এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তিনি যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন, তা তাকে নীরব কিন্তু কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক রাজনীতিতে তিনি এগিয়ে থাকলেও দলীয় উচ্চপর্যায়ের সমর্থন কতটা পাবেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করছেন ইয়াসিন আরাফাত। রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সংযোগ তার জন্য একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি করলেও মাঠপর্যায়ে নিজস্ব নেতৃত্ব কতটা প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন—সেটিই তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। একইভাবে প্রয়াত সাবেক চেয়ারম্যানের সন্তান হিসেবে অ্যাডভোকেট জাহিদ হাসান রুবেল ‘সহানুভূতি ও ঐতিহ্যের’ ভোটব্যাংক তৈরির চেষ্টা করছেন, যা স্থানীয় রাজনীতিতে প্রায়ই কার্যকর ভূমিকা রাখে।

এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতার সুযোগ কাজে লাগাতে চাচ্ছে এনসিপি। আলিফ দেওয়ান ও সানাউল্লাহ সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান তৈরি করার চেষ্টা করছেন। যদিও সাংগঠনিকভাবে তারা এখনো পিছিয়ে, তবে ভোটের মাঠে ‘বিকল্প শক্তি’ হিসেবে তারা কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এনায়েতনগরের নির্বাচনী বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে জনদুর্ভোগ। দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং নাগরিক সেবার ঘাটতি ভোটারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করেছে। ফলে ব্যক্তিগত ইমেজ বা দলীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ‘কে বাস্তবে কাজ করতে পারবে’—এই প্রশ্নই হয়ে উঠছে ভোটের মূল নির্ধারক।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়নই হবে ‘গেম চেঞ্জার’। ভুল প্রার্থী নির্বাচন করলে দলীয় কোন্দল বাড়তে পারে, যার সুযোগ নিতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি। আবার সঠিক সমন্বয় করতে পারলে বিএনপি এখানে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

সব মিলিয়ে এনায়েতনগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন শুধু একটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন নয়; এটি হয়ে উঠেছে অভিজ্ঞতা বনাম নতুন নেতৃত্ব, সংগঠন বনাম জনপ্রিয়তা এবং ঐতিহ্য বনাম পরিবর্তনের এক জটিল রাজনৈতিক লড়াই। এখন দেখার বিষয়—শেষ পর্যন্ত কোন সমীকরণ বিজয়ের পথে এগিয়ে যায়।