আজমেরী ওসমানের নামে বিচ্ছিন্ন অনুসারীদের ঝটিকা মিছিল নিয়ে প্রশাসনে সর্বোচ্চ সতর্কতা

111

নিজস্ব প্রতিবেদক :

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে টানা প্রায় ১৬ বছরের আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগেই নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সদস্যরা শহর ছেড়ে চলে যান বলে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। এরপর প্রায় এক বছর কেটে গেলেও পরিবারের অন্যতম আলোচিত সদস্য আজমেরী ওসমানকে ঘিরে আলোচনা থামেনি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে তার নামে কয়েকটি ঝটিকা মিছিল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারীদের তৎপরতা নতুন করে তাকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

প্রশাসনের একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, পলাতক অবস্থায় থাকা আজমেরী ওসমানের নামে যে মিছিলগুলো হচ্ছে, সেগুলোতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ জনের বেশি অংশগ্রহণকারী থাকে না। ইতোমধ্যে এসব মিছিলে অংশ নেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। প্রশাসনের দাবি, বড় ধরনের কোনো সাংগঠনিক শক্তি নয়, বরং বিচ্ছিন্ন কিছু অনুসারী নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে।

লক্ষ করা গেছে, এসব মিছিলে ব্যবহৃত ব্যানারে “নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবলীগ” লেখা থাকছে। তবে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ভাষ্য, অতীতে আজমেরী ওসমান কখনো যুবলীগের কোনো সাংগঠনিক পদে ছিলেন না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি মূলত তার অনুসারীদের নিজস্ব উদ্যোগে ব্যবহার করা পরিচয়, যার সাংগঠনিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের উত্থানের ইতিহাস কয়েক দশকের পুরোনো। ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর জাতীয় পার্টির উত্থান ঘটে। সেই সময় প্রয়াত নাসিম ওসমান জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে তিনি জেলার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। একই সময়ে তার ছোট ভাই শামীম ওসমান আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে দ্রুত উত্থান ঘটান। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দুই ভাইয়ের রাজনৈতিক প্রভাবের ছায়ায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যেরও প্রভাব বিস্তার ঘটে।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য এবং বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশির দশকের শেষ ভাগ থেকেই আজমেরী ওসমানের নাম বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে শুরু করে। অভিযোগ রয়েছে, কৈশোরেই তিনি একদল কিশোর ও তরুণকে নিয়ে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ গড়ে তোলেন, যা পরবর্তী সময়ে শহরের বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। সেই সময় তার কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতীয় দৈনিক মানবজমিন ও দিনকাল-এ ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এসব প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও সহিংস কর্মকাণ্ডের নানা অভিযোগ উঠে আসে, যা সে সময় নারায়ণগঞ্জ ছাড়িয়ে দেশব্যাপী আলোচনার জন্ম দেয়।

পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন আলোচিত হত্যা মামলায়ও আজমেরী ওসমানের নাম আসে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যা মামলা। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ অপহরণের পর নিহত হয় মেধাবী শিক্ষার্থী ত্বকী। এ হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তদন্তের একপর্যায়ে র‍্যাব সংবাদ সম্মেলনে শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমানসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলে ধরে। তবে মামলাটির বিচার এখনো শেষ হয়নি এবং অভিযুক্তরা বিভিন্ন সময়ে নিজেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ ছাড়া ব্যবসায়ী মাঈনুল পারভেজ, নূরুন্নবী, আলমগীর, আশিক ইসলাম, অটোরিকশাচালক জামাল, নূরুল আমিন মাকসুদসহ একাধিক আলোচিত হত্যা মামলায়ও তার নাম এসেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে মোট ১৬টি হত্যা মামলার অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার অনেকগুলো এখনো বিচারাধীন এবং কয়েকটির তদন্ত বা বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান। তাই অভিযোগগুলোর বিষয়ে আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

আমলাপাড়া এলাকায় উদ্ধার হওয়া আলোচিত খণ্ডিত মরদেহের ঘটনাতেও বিভিন্ন সময়ে আজমেরী ওসমানের নাম জনমনে আলোচিত হয়েছে। যদিও ওই ঘটনাসহ বিভিন্ন অভিযোগের অনেকগুলোরই বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো সম্পন্ন হয়নি।

দীর্ঘ সময় ধরে নারায়ণগঞ্জে আজমেরী ওসমানকে ঘিরে দুই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। একদিকে সমালোচকদের অভিযোগ, তিনি ছিলেন ভয়ভীতির একটি প্রতীক; অন্যদিকে তার অনুসারীরা তাকে নিজেদের নেতা হিসেবে তুলে ধরতেন। শহর, বন্দর ও ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকায় তার একটি বড় মোটরসাইকেল বহর বা ‘হোন্ডা বাহিনী’ ছিল বলে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা শক্তি প্রদর্শনের সময় এই বহরের উপস্থিতি প্রায়ই আলোচনার জন্ম দিত।

তবে ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই দৃশ্যপট আমূল বদলে গেছে। একসময় যাদের প্রকাশ্য উপস্থিতি ছিল, তাদের অধিকাংশই এখন আত্মগোপনে। তবুও মাঝেমধ্যে ছোট ছোট ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে আজমেরী ওসমানের অনুসারীরা নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, এসব তৎপরতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং আইন ভঙ্গের কোনো ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ওসমান পরিবারের প্রভাব একসময় বাস্তবতা ছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তারপরও অতীতের দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রভাব, বিচারাধীন আলোচিত মামলাগুলো এবং একটি সীমিত অনুসারী গোষ্ঠীর সক্রিয়তার কারণে আজমেরী ওসমান এখনো নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ও বিতর্কিত এক নাম হয়ে আছেন।