আমজাদ হোসেন :
নারায়ণগঞ্জে নতুন পুলিশ সুপার মো. হাবিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলা পুলিশের কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং ও অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান শুরু হওয়ায় নড়েচড়ে বসেছে অপরাধীচক্র। মাঠপর্যায়ে পুলিশের এই তৎপরতা ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যেও নতুন করে স্বস্তি ও প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
৩ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব নেন মো. হাবিবুর রহমান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের কথা জানান। এরই মধ্যে জেলার সাত থানায় একযোগে অভিযান, মাদকবিরোধী অভিযান এবং অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন পুলিশ সুপার শুধু অফিসে বসে নির্দেশনা দেওয়ার পরিবর্তে নিজেও মাঠপর্যায়ের অভিযানে উপস্থিত হচ্ছেন। জিমখানা ও ঋষিপাড়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযানে তার সরাসরি উপস্থিতি এবং রূপগঞ্জে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে অভিযানে তার নেতৃত্ব ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।
পুলিশের এই দৃশ্যমান তৎপরতার প্রভাব পড়েছে অপরাধীদের মধ্যেও। বিশেষ করে মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয়দের অনেকে মনে করছেন। ৪ ও ৫ সেপ্টেম্বর জেলার সাত থানায় পরিচালিত বিশেষ অভিযানে ১০৪ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। পরবর্তী অভিযানেও বিভিন্ন থানায় বিপুলসংখ্যক মানুষকে আটক ও গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
৯ সেপ্টেম্বরের অভিযানে পাঁচজন মাদক কারবারি ও ৮৭ জন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তারের তথ্যও প্রকাশ করেছে পুলিশ। এর আগে সোনারগাঁয়ে বিশেষ অভিযানে মাদক কারবারিসহ ৩০ জনকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়।
এদিকে রূপগঞ্জের তারাবো এলাকায় মাদক ব্যবসার আধিপত্যকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ও অস্ত্রের মহড়ার পর পুলিশ অভিযান চালিয়ে গুলিভর্তি পিস্তলসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে। ওই অভিযানে পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন বলে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জের সচেতন মহলের মতে, একজন পুলিশ সুপার যখন নিজে মাঠে থাকেন, তখন তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের ওপরও স্বাভাবিকভাবেই কাজের চাপ তৈরি হয়। ফলে থানার পুলিশ থেকে শুরু করে গোয়েন্দা ইউনিট—সব পর্যায়েই তৎপরতা বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আর এর সরাসরি সুফল পেতে পারেন সাধারণ মানুষ।
গত কয়েক বছরে নারায়ণগঞ্জে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাং ও স্থানীয় আধিপত্যের নানা অভিযোগ নিয়ে জনমনে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন এলাকায় অপরাধীচক্রের পেছনে রাজনৈতিক কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগও দীর্ঘদিনের। তবে এসব অভিযোগের সবগুলোর সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
এখানেই নতুন পুলিশ সুপারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের মতে, শুধু মাদক বহনকারী, খুচরা বিক্রেতা, সেবনকারী কিংবা মাঠপর্যায়ের সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করলেই অপরাধের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়। অপরাধীদের যারা অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব, অস্ত্র কিংবা নিরাপদ আশ্রয় দেয়—তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।
কারণ একটি মাদকচক্রে নিচের সারির কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে যদি মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়, তাহলে কিছুদিন পর আবারও একই নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে ওঠার আশঙ্কা থাকে। একইভাবে চাঁদাবাজির ক্ষেত্রেও শুধু চাঁদা আদায়কারীকে আটক করে যদি এর পেছনের নির্দেশদাতা ও অর্থের ভাগীদারদের শনাক্ত করা না হয়, তাহলে স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না।
এ কারণে নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা এখন এক জায়গায় এসে ঠেকেছে—নতুন এসপির এই অভিযান যেন কেবল শুরুতেই সীমাবদ্ধ না থাকে। নিয়মিত, নিরপেক্ষ ও তথ্যভিত্তিক অভিযান অব্যাহত থাকুক। রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাব বিবেচনা না করে অপরাধী হিসেবে যার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, তাকেই আইনের আওতায় আনা হোক।
নারায়ণগঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই অভিযান কি সাময়িক, নাকি সত্যিই দীর্ঘমেয়াদি অপরাধ দমন অভিযানের সূচনা?
পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান ইতোমধ্যে বলেছেন, মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং কোনো অপরাধী ছাড় পাবে না।
এখন সেই বক্তব্যের বাস্তব প্রতিফলন কতটা দেখা যায়, সেটিই দেখার বিষয়। আর তিনি যদি মাঠের এই তৎপরতা ধরে রাখতে পারেন এবং একই সঙ্গে অপরাধের নেপথ্যের শেল্টারদাতা ও অর্থের জোগানদাতাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারেন, তাহলে নারায়ণগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে—এমন প্রত্যাশাই এখন জেলাবাসীর।




