আমজাদ হোসেন :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের (নাসিক) আওতাভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে জরিপ শুরু করেছে প্রশাসন। এরই অংশ হিসেবে গতকাল এনায়েতনগর, ফতুল্লা ও কুতুবপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন জরিপকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তারা। মাঠের বাস্তব চিত্র দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন তারা। তাদের পর্যবেক্ষণ, এসব এলাকা যে মাত্রায় নগরায়িত হয়েছে, তাতে অন্তত এক দশক আগেই ইউনিয়নগুলোকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনা প্রয়োজন ছিল।
জরিপে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মতে, ফতুল্লার বিভিন্ন এলাকা এখন আর প্রচলিত অর্থে ইউনিয়ন এলাকার বৈশিষ্ট্য বহন করছে না। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত স্থাপনা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার বিস্তার এবং শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযোগের কারণে এসব এলাকা কার্যত নারায়ণগঞ্জ নগরের সম্প্রসারিত অংশে পরিণত হয়েছে। অথচ প্রশাসনিক কাঠামোর দিক থেকে এখনো ইউনিয়ন পরিষদের আওতায় থাকায় নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে।
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা জানান, জরিপের সময় তারা এলাকার সার্বিক অবস্থা আরও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোন ওড়ানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে এমন একটি পর্যাপ্ত খোলা জায়গা খুঁজে পাওয়া যায়নি, যেখান থেকে নিরাপদে ড্রোন উড়ানো সম্ভব। চারদিকে ঘনবসতি ও স্থাপনার বিস্তার তাদের কাছে এলাকার দ্রুত নগরায়ণের একটি বাস্তব চিত্র হিসেবে ধরা পড়ে।
প্রশাসনের কর্মকর্তাদের এই পর্যবেক্ষণকে শুধু একটি জরিপের মন্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা, কুতুবপুর, এনায়েতনগর, কাশীপুর ও গোগনগর ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার দাবি রয়েছে। এসব এলাকার জনসংখ্যা, শিল্পকারখানা, আবাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগব্যবস্থা ইতোমধ্যে নগরকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। ফলে ইউনিয়ন পরিষদের পুরনো কাঠামো দিয়ে ক্রমবর্ধমান নগরবাসীর নাগরিক চাহিদা পূরণ করা কতটা সম্ভব, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষের শুনানি
পাঁচ ইউনিয়নকে সিটি করপোরেশনের অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়ায় এর আগে জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর শুনানিও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ইউনিয়নগুলোর সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি, স্থানীয় জনগণের মতামত, প্রশাসনিক বাস্তবতা এবং সিটি করপোরেশনের সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়।
শুনানির পর এবার মাঠপর্যায়ে জরিপ শুরু হওয়ায় পুরো প্রক্রিয়াটি আরও এক ধাপ এগিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে যে চিত্র পেয়েছেন, তাতে পাঁচ ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফতুল্লায় নগরায়ণের চাপ সবচেয়ে বেশি
এনায়েতনগর, ফতুল্লা ও কুতুবপুরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শনের সময় কর্মকর্তারা দেখতে পান, বহু জায়গায় ইউনিয়ন এলাকার প্রচলিত চেহারা প্রায় হারিয়ে গেছে। একের পর এক বাড়িঘর, বহুতল ভবন, দোকানপাট, কলকারখানা ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে ওঠায় খোলা জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বিশেষ করে ফতুল্লার ক্ষেত্রে নগরায়ণের চাপ দীর্ঘদিনের। নারায়ণগঞ্জ শহরের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হওয়ায় এই এলাকার আবাসন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার দ্রুত ঘটেছে। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা বসতি ও স্থাপনার কারণে ভবিষ্যতে পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জরিপকারী কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় আনার উদ্যোগ আর বিলম্বিত হলে নগর ব্যবস্থাপনার সংকট আরও দ্রুত বাড়তে পারে। এখনই কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে সড়ক, ড্রেনেজ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জলাবদ্ধতা, নাগরিক সেবা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে।
‘আর দেরি করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হবে’
প্রশাসনের মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, ফতুল্লা ও আশপাশের ইউনিয়নগুলোকে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়ার বিষয়টি এখন শুধু প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়; বরং দ্রুত পরিবর্তনশীল একটি নগর এলাকার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার প্রশ্ন।
জরিপকারী কর্মকর্তারা মনে করছেন, বর্তমান বাস্তবতায় এসব ইউনিয়নকে আর দীর্ঘদিন ইউনিয়ন পরিষদ কাঠামোর মধ্যে রেখে দিলে নগরায়ণের সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যবস্থার দূরত্ব আরও বাড়বে। তাদের মতে, যে বাস্তবতা তারা মাঠে দেখেছেন, তাতে অন্তত দশ বছর আগেই এসব এলাকা সিটি করপোরেশনের আওতায় আসা উচিত ছিল।
এখন প্রশ্ন—এই বিলম্বের পরও কি আর সময়ক্ষেপণ করা হবে, নাকি বাস্তব নগরায়ণের চিত্র বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে?
প্রশাসনের চলমান জরিপ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজারই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তবে মাঠের বাস্তবতা যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রধান মানদণ্ড হয়, তাহলে ফতুল্লা, এনায়েতনগর, কাশীপুর, গোগনগর ও কুতুবপুরের বর্তমান চিত্র বলছে—এগুলোকে আর শুধুই ইউনিয়ন হিসেবে দেখার সুযোগ ক্রমেই ফুরিয়ে আসছে।




