আমজাদ হোসেন :
নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডের আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে পুরনো একটি প্রভাবশালী বলয়—এমন অভিযোগ উঠেছে ক্লাবের একাধিক সদস্যের কাছ থেকে। আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে নেপথ্যে থেকে বিভিন্নভাবে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে বলে দাবি করছেন তারা।
ক্লাব সদস্যদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ ক্লাবটি যে ব্যাপক জনরোষের মুখে পড়েছিল, তার পেছনে তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাবের ভূমিকা ছিল। তাদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে ক্লাবটি ধীরে ধীরে একটি বিশেষ রাজনৈতিক পরিবারের প্রভাববলয়ে চলে যায়। ফলে একটি ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ক্লাবটির নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
সদস্যদের একটি অংশের অভিযোগ, ওই সময়ে ক্লাবের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় একটি নির্দিষ্ট পরিবারের ঘনিষ্ঠদের প্রভাব ছিল। এমনকি সভাপতির পদ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে একই বলয়ের প্রভাব ছিল বলে তারা দাবি করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জে সংঘর্ষ ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ১৯ জুলাই আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের একটি ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদনে ওই ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমান, তার শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটুসহ কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে দেখা যাওয়ার কথা বলা হয়।
এ ঘটনার পর শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা ও গুলিবর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। একটি মামলার এজাহারে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সাবেক সভাপতি আসিব হাসান মাহমুদের নামও আসামি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
৫ আগস্টের পর বদলে যায় ক্লাবের চিত্র
৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জ ক্লাবও বড় ধরনের সংকটের মধ্যে পড়ে। ক্লাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের মতে, তখন অনেকেই প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নিতে আগ্রহী ছিলেন না। একদিকে ছিল জনরোষের আশঙ্কা, অন্যদিকে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো ও ক্লাবের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের কঠিন চ্যালেঞ্জ।
এ সময় ব্যবসায়ী নেতা এম সোলায়মান দায়িত্ব নেন। ২৯ আগস্ট ২০২৪-এ বিশেষ সভার মাধ্যমে নতুন কমিটি গঠনের পর তাকে ক্লাবের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং একই বছরের ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি সভাপতি নির্বাচিত হন।
এরপর ক্লাবের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা, অবকাঠামো সংস্কার এবং সদস্যদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তী নির্বাচনে সোলায়মান আবারও সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০২৫ সালের নির্বাচনে তিনি ৯০০ ভোটের বেশি পেয়ে জয়ী হন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনেও তিনি বড় ব্যবধানে জয় পান। ২ হাজার ৪৫৭ জন ভোটারের মধ্যে ১ হাজার ৫৫২ জন ভোট দেন এবং সোলায়মান ১ হাজার ১৯৬ ভোট পেয়ে সভাপতি নির্বাচিত হন। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ২০২৬ সালের বোর্ডেও এম সোলায়মানই সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এবার লক্ষ্য ডিসেম্বরের নির্বাচন
ক্লাবের একাধিক সদস্যের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি যখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরছে, ঠিক তখনই পুরনো প্রভাবশালী বলয়ের কিছু ব্যক্তি আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, আসন্ন ডিসেম্বরের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নেপথ্যে থেকে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।
ক্লাব সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের ভাষ্য, একজন প্রভাবশালী গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এ তৎপরতার নেপথ্যে রয়েছেন বলে তারা মনে করছেন। অতীতে তাকে তৎকালীন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে দেখা যেত—এমন দাবিও করেছেন কয়েকজন সদস্য।
তাদের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে ওই ব্যবসায়ী কিছু সময় আড়ালে চলে যান। পরে ব্যবসায়ী মহলের কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সহযোগিতায় তিনি আবার প্রকাশ্য কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন এবং ব্যবসায়ী সংগঠনের বিভিন্ন পদেও দায়িত্ব নেন। এখন সেই ব্যক্তি আবার নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ওই ব্যবসায়ীর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোকে আপাতত সংশ্লিষ্ট ক্লাব সদস্যদের বক্তব্য হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
‘পুরনো প্রভাব’ ফিরতে দেওয়া হবে না—সদস্যদের একাংশ
ক্লাব সদস্যদের একটি বড় অংশ বলছেন, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন কিংবা কোনো পরিবারের ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। এটি শহরের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক প্রতিষ্ঠান। ফলে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব নির্বাচনে রাজনৈতিক পরিচয় বা অতীতের প্রভাব নয়, বরং ক্লাব পরিচালনার দক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সদস্যদের আস্থাই প্রধান বিবেচনা হওয়া উচিত।
তাদের মতে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় ক্লাবকে ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, সেটি থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। কোনো রাজনৈতিক শক্তির ছত্রচ্ছায়ায় ক্লাব পরিচালিত হচ্ছে—এমন ধারণা তৈরি হলে ভবিষ্যতেও প্রতিষ্ঠানটি সংকটে পড়তে পারে।
একজন প্রবীণ ক্লাব সদস্য বলেন, “ক্লাবকে আবার কোনো রাজনৈতিক বলয়ের হাতে তুলে দেওয়া হলে অতীতের পরিস্থিতি ফিরে আসার আশঙ্কা থাকবে। আমরা চাই নির্বাচন হোক সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এবং সদস্যরাই সিদ্ধান্ত নিক কে ক্লাব পরিচালনা করবেন।”
নির্বাচনে নতুন সমীকরণের আভাস
আগামী ডিসেম্বরের নির্বাচন এখনো কয়েক মাস দূরে। ফলে প্রার্থী, প্যানেল কিংবা জোটের চূড়ান্ত চিত্র স্পষ্ট হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে—বর্তমান নেতৃত্ব কি আবারও সদস্যদের আস্থা ধরে রাখতে পারবে, নাকি পুরনো প্রভাববলয়ের সঙ্গে যুক্ত কোনো নতুন মুখ মাঠে নামবে?
২০২৪ সালের পরপরই অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ‘পরিবর্তন’ এবং ‘ক্লাবকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখার’ বিষয়টি আলোচনায় এসেছিল। ২০২৪ সালের নির্বাচনে এম সোলায়মান সভাপতি পদে ৯১৮ ভোট পেয়ে জয়ী হন এবং তার প্রতিদ্বন্দ্বী মাহবুবুর রশিদ জুয়েল পান ৬৭১ ভোট। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের একটি প্রতিবেদনে সেই নির্বাচনকে ‘ওসমানীয় প্রভাবমুক্ত’ নির্বাচন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল।
এবারও সেই অতীতের ছায়া নির্বাচনী মাঠে পড়বে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ক্লাব সদস্যদের একটি অংশের ধারণা, যারা ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের সময় ক্লাবের ভাবমূর্তি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ার পেছনে দায়ী বলে তারা মনে করেন, তাদের ঘনিষ্ঠ কোনো মহল এবার নেতৃত্বে ফেরার চেষ্টা করলে সদস্যরা তা সহজভাবে নেবেন না। তবে শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে কোন পক্ষ কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তা নির্ভর করবে প্রার্থী নির্বাচন, প্যানেল গঠন এবং সদস্যদের মনোভাবের ওপর।
সব মিলিয়ে, নারায়ণগঞ্জের অভিজাত ও ঐতিহ্যবাহী এই ক্লাবের আসন্ন নির্বাচন শুধু একটি নিয়মিত বার্ষিক নির্বাচন হিসেবেই থাকছে না; বরং ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্লাবটি কোন পথে এগোবে—তারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
ডিসেম্বরের ভোটে কি নতুন নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে, নাকি পুরনো প্রভাববলয় নতুন পরিচয়ে ফিরে আসবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখন খুঁজছেন নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সদস্যরা।




