শুরুটা সেই নব্বইয়ের দশকে

নতুন রুপে টিপু-জাকিরের পূরনো বিরোধ, বিএনপিতে উত্তাপ

296

নিজস্ব প্রতিবেদক :

নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে আবু আল ইউসুফ খান টিপু ও জাকির খানের বিরোধ নতুন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় তিন দশক আগে শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক দূরত্ব সময়ের সঙ্গে কখনো প্রকাশ্যে এসেছে, কখনো আড়ালে থেকেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপুর একাধিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সেই পুরনো বিরোধ আবারও প্রকাশ্য আলোচনায় এসেছে।

টিপুর বক্তব্য—জাকির খান বিএনপির কোনো নেতা নন, তিনি দলের কোনো দায়িত্বশীল পদে নেই—এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাকির খানের সমর্থকদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। বিষয়টি এখন শুধু দুই ব্যক্তির বক্তব্য-পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ভেতরে পুরনো রাজনৈতিক বিভাজন নতুন করে সক্রিয় হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে টিপুর বক্তব্য উদ্ধৃত করে জাকির খানকে দলের কোনো পদে না থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

শুরুটা সেই নব্বইয়ের দশকে

নারায়ণগঞ্জের প্রবীণ রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বর্ণনায়, টিপু ও জাকির খানের বিরোধের সূত্রপাত নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রভাব ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। ওই সময় জাকির খান আওয়ামী লীগ ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আলোচনায় আসেন।

বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে ওই সময় জাকির খানের বিরুদ্ধে মামলা, কারাবরণ এবং পরবর্তী সময়ে ছাত্রদলের নেতৃত্বে আসার বিষয়টি উঠে এসেছে। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার সাত মাসের মাথায় কাশীপুর বাংলাবাজার এলাকায় এক ঠিকাদারের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে করা মামলায় জাকির খান দ্বিতীয় দফায় পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড পান। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় তিনি প্রায় চার বছর কারাগারে ছিলেন। পরে ১৯৯৯ সালে স্বল্প সময়ের জন্য কারামুক্ত হয়ে জেলা ছাত্রদলের সভাপতির দায়িত্ব পান বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই সময়কার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে যে বর্ণনা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত, সেটি আরও বিস্তৃত। সেই বর্ণনা অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জাকির খান ও তার অনুসারীরা নানা ধরনের চাপ ও নির্যাতনের মুখোমুখি হওয়ার অভিযোগ করলেও তৎকালীন জেলা ছাত্রদলের সভাপতি আবু আল ইউসুফ খান টিপুর সঙ্গে তাদের রাজনৈতিক বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে।

জাকিরপন্থীদের অভিযোগ ছিল, টিপু তাদের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে তৎকালীন প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা শামীম ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার রাজনীতি করছেন। এই অভিযোগকে কেন্দ্র করেই দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক দূরত্ব আরও বাড়ে। তবে টিপুর বিরুদ্ধে ওই সময়কার অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য দলিলভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি—ফলে এটিকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

নেতৃত্বের প্রশ্নে বড় মোড়

নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে প্রচলিত আরেকটি বর্ণনা হলো, এক পর্যায়ে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে জাকির খানকে জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বে আনা হয় এবং টিপু নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়েন।

এই দাবির সরাসরি দলিল অনলাইনে পাওয়া যায়নি। তবে বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদনে জাকির খানকে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ১৯৯৯ সালে কারামুক্তির পর তিনি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি হন বলে একাধিক প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

অর্থাৎ, নেতৃত্বের সেই পরিবর্তন দুই পক্ষের রাজনৈতিক সম্পর্কের ওপর দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছিল—এমন ধারণা নারায়ণগঞ্জের বিএনপির পুরনো নেতাকর্মীদের একটি অংশের মধ্যে রয়েছে।

জাকিরের রাজনৈতিক উত্থান, টিপুর আলাদা পথ

পরবর্তী সময়ে জাকির খান নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী নিজস্ব বলয় তৈরি করেন। দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে অবস্থান করেও তার অনুসারীদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় ছিল বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

অন্যদিকে আবু আল ইউসুফ খান টিপুও বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় থেকে পরবর্তীতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিবের দায়িত্বে আসেন। ১৯৯৬ সালের জেলা ছাত্রদলের নেতৃত্বের সঙ্গে তার বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থানের একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ তৈরি হয়েছে। ১৯৯৬ সালের জেলা ছাত্রদল কমিটিতে টিপুর নেতৃত্বের বিষয়টিও স্থানীয় সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ফলে সময়ের ব্যবধানে দুজনই নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করলেও তাদের পুরনো বিরোধের রেশ পুরোপুরি মুছে যায়নি বলেই মনে করছেন স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকে।

২০২৪-এর পর আবার প্রকাশ্যে পুরনো বিরোধ

৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নারায়ণগঞ্জে বিএনপির বিভিন্ন নেতাকর্মীর সক্রিয়তা বাড়ে। কারামুক্তির পর জাকির খানকে ঘিরে বড় ধরনের শোডাউনও হয়। সমকালসহ জাতীয় সংবাদমাধ্যমে তার কারামুক্তির পর শোডাউনের খবর প্রকাশিত হয়। একই সময় টিপুর বক্তব্য নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়।

জাকির খানের সমর্থকদের পক্ষ থেকে তখন টিপুর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও বক্তব্য সামনে আসে। ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদনেও জাকিরের সমর্থকদের পক্ষ থেকে টিপুর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের অভিযোগ তোলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ, পুরনো বিরোধটি ২০২৪ সালের পর আবারও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

এবার টিপুর বক্তব্যে নতুন করে উত্তাপ

সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়েছে টিপুর বক্তব্যকে কেন্দ্র করে। জাকির খানকে উদ্দেশ করে টিপু বলেছেন, জাকির খান বিএনপির কোনো পদে নেই এবং দলের কোনো ভূমিকা নেই। একই বক্তব্যে জাকিরের পাশে থাকা কিছু ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

রাজনৈতিকভাবে এই বক্তব্যের গুরুত্ব রয়েছে। কারণ টিপু নিজে বর্তমানে মহানগর বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্বে রয়েছেন। ফলে তার বক্তব্যকে অনেকেই ব্যক্তিগত মন্তব্য হিসেবে না দেখে দলীয় রাজনীতির একটি অংশের অবস্থান হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।

অন্যদিকে জাকির খানের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টিপুর বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করছেন। এর ফলে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও উত্তেজনা বাড়ছে।

প্রশ্ন উঠছে, জাকিরের জনপ্রিয়তা নাকি সাংগঠনিক পদ—কোনটি বড়?

এখানেই বর্তমান বিরোধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নটি সামনে এসেছে।

টিপুর বক্তব্যের মূল ভিত্তি হলো সাংগঠনিক পদ। অর্থাৎ বিএনপির কোনো দায়িত্বশীল পদে না থাকলে কাউকে দলের বর্তমান নেতৃত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না—সেই প্রশ্ন।

অন্যদিকে জাকির খানের অনুসারীদের যুক্তি হচ্ছে, সাংগঠনিক পদ না থাকলেও দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ার, সাবেক ছাত্রদল নেতৃত্ব এবং তার সঙ্গে থাকা নেতাকর্মীদের কারণে তিনি নারায়ণগঞ্জ বিএনপির রাজনীতিতে প্রভাবশালী একটি নাম।

২০২৫ সালেও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের আলোচনায় জাকির খানের নাম এসেছে। একই তালিকায় টিপুর নামও ছিল। অর্থাৎ রাজনৈতিকভাবে দুজনের নামই নারায়ণগঞ্জ বিএনপির ভবিষ্যৎ সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আসছে।

এখানেই হয়তো বর্তমান বিরোধের গভীরতর রাজনৈতিক কারণ খুঁজছেন অনেকে।

পুরনো দ্বন্দ্বের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে ব্যক্তি-কেন্দ্রিক বলয় নতুন কোনো বিষয় নয়। একেক নেতাকে ঘিরে একেকটি কর্মীসমর্থক গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। জাকির খানের ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি শক্তিশালী অনুসারী বলয়ের কথা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। অন্যদিকে টিপু বর্তমানে মহানগর বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বে থাকায় তারও নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে।

ফলে ১৯৯৬-এর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দূরত্বের সঙ্গে বর্তমান সাংগঠনিক ক্ষমতা, নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা এবং ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতি—সবকিছু মিলে নতুন করে সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

জাকিরের পাশে কারা, টিপুর পাশে কারা?

সাম্প্রতিক বিরোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দুই নেতাকে ঘিরে গড়ে ওঠা সমর্থক বলয়।

জাকির খানের সমর্থকদের একটি অংশ তাকে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির পুরনো ও ত্যাগী নেতা হিসেবে তুলে ধরছে। এমনকি তার সমর্থকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে তাকে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে টিপুর সমর্থকরা বলছেন, দলের সাংগঠনিক কাঠামো ও বর্তমান দায়িত্বই রাজনৈতিক বৈধতার প্রধান মাপকাঠি। ফলে দলের কোনো দায়িত্বশীল পদে না থাকা কাউকে দলের বর্তমান নেতৃত্বের অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়।

দুই পক্ষের এই অবস্থান কার্যত দুটি আলাদা রাজনৈতিক দর্শনকে সামনে আনছে—জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিগত বলয় বনাম সাংগঠনিক পদ ও দলীয় কাঠামো।

সংঘাত কোথায় গিয়ে থামবে?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন এটাই—টিপু ও জাকিরের পুরনো বিরোধ কি আবারও সরাসরি রাজনৈতিক সংঘাতে রূপ নেবে?

এ মুহূর্তে তার কোনো নিশ্চিত উত্তর নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দুই পক্ষের উত্তপ্ত বক্তব্য, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং পুরনো ইতিহাস টেনে আনা দেখে বোঝা যাচ্ছে, বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত বিরোধের পর্যায়ে নেই।

বরং নারায়ণগঞ্জ বিএনপির আগামী দিনের নেতৃত্বের সমীকরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।

কারণ, তিন দশক আগে যে বিরোধের সূত্রপাত হয়েছিল ছাত্রদলের নেতৃত্বকে কেন্দ্র করে, সময়ের ব্যবধানে সেই বিরোধ এখন এসে ঠেকেছে বিএনপির নেতৃত্ব, সাংগঠনিক কর্তৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের প্রশ্নে।

তাই প্রশ্নটা এখন আর শুধু টিপু বনাম জাকির নয়। প্রশ্ন হলো—নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে আগামী দিনে প্রভাব বিস্তার করবে সাংগঠনিক পদ, নাকি মাঠের জনপ্রিয়তা ও ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বলয়?

এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো নির্ধারণ করবে টিপু-জাকির বিরোধের পরবর্তী অধ্যায়।