আইনশৃঙ্খলা ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে উদ্বেগ...

ছয় মাসেই বড় পরীক্ষায় তারেক রহমান সরকার

114

স্টাফ রিপোর্টার:

সকালটাই নাকি বলে দেয় সারাদিন কেমন যাবে। প্রচলিত এই কথাটিই যেন এখন ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম ছয় মাসের কর্মকাণ্ড নিয়ে। দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর ক্ষমতায় এসে বিএনপি সরকার প্রথম ১৮০ দিনের জন্য যে অগ্রাধিকারভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল, তার মধ্যে আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল।

কিন্তু ছয় মাস পূর্ণ হওয়ার পরও এই দুটি ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে মানুষের উদ্বেগ ও সমালোচনা রয়েছে, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট সরাসরি আঘাত করছে সাধারণ জীবন, শিল্প-কারখানা ও অর্থনীতিতে। ফলে সরকার পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সক্ষমতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন অনেকে।

অবশ্য সরকারের পক্ষ থেকে পরিস্থিতির উন্নতির দাবি করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি বলেছেন, সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে জনগণের প্রত্যাশার পর্যায়ে পৌঁছাতে আরও সময় প্রয়োজন বলেও তিনি স্বীকার করেছেন।

অন্যদিকে জ্বালানি সংকটের ক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্য আরও কঠিন। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ১৬ আগস্ট বলেছেন, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে পুরোপুরি সমাধান করা সম্ভব নয়; পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলএনজি টার্মিনাল ও সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো তৈরিতেই ১৮ মাস থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

এই বক্তব্যই এখন সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক ও জনমতের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। কারণ ক্ষমতায় আসার আগে এবং ক্ষমতা গ্রহণের পর বিএনপি মানুষের কাছে দ্রুত পরিবর্তন ও স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি করেছিল। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে স্থিতিশীলতা আনার কথা অগ্রাধিকার হিসেবে জানিয়েছিল।

কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ছয় মাসের মাথায়ও মানুষ গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের ভোগান্তি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়ে এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, টার্মিনাল-সংক্রান্ত সমস্যা এবং গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সাধারণ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতেও হয়েছে। ১৫ আগস্ট তিনি দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতির আশা প্রকাশ করে বলেন, সরকার সংকটের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে কাজ করছে।

তবে এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মানুষ কতদিন অপেক্ষা করবে?

অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য যদি ধরে নেওয়া হয় যে গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট পুরোপুরি সমাধানে অন্তত দুই বছর লাগবে, তাহলে আগামী দুই বছর সরকারকে একই সঙ্গে সংকট মোকাবিলা এবং মানুষের ধৈর্য ধরে রাখার কঠিন রাজনৈতিক কাজটি করতে হবে। কারণ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট শুধু ঘরের আলো কিংবা রান্নার চুলার সমস্যা নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতি।

এ কারণেই জ্বালানি সংকটকে এখন শুধু একটি কারিগরি সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ধীরে ধীরে সরকারের জনপ্রিয়তা ও প্রশাসনিক সক্ষমতার প্রশ্নেও পরিণত হচ্ছে।

সরকার অবশ্য বসে নেই। সাম্প্রতিক এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং সময়মতো এলএনজি আমদানির বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৯ সাল পর্যন্ত জ্বালানি সরবরাহের একটি পরিকল্পনাও চাওয়া হয়েছে।

কিন্তু সরকারের জন্য দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি।

ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছিলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় দলীয় প্রভাব কিংবা রাজনৈতিক ক্ষমতা নয়, আইনের শাসনই হবে চূড়ান্ত কথা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং জননিরাপত্তাকে তিনি সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

ছয় মাস পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও বলছেন পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আরও সময় প্রয়োজন বলে তার বক্তব্যে স্বীকারোক্তির সুরও রয়েছে। এখানেই সরকারের সঙ্গে সাধারণ মানুষের উপলব্ধির পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সরকার যদি মনে করে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ যদি রাস্তাঘাট, মাদক, ছিনতাই, সংঘাত কিংবা সামাজিক অস্থিরতার কারণে নিরাপত্তাহীনতা অনুভব করে, তাহলে রাজনৈতিকভাবে শেষ পর্যন্ত মানুষের অভিজ্ঞতাই বড় হয়ে দাঁড়াবে।

বিশেষ করে মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকলে বিষয়টি আরও জটিল হতে পারে। মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি তরুণ সমাজ, পরিবার, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। ফলে সরকার যদি মাদক নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে সমালোচনা আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় বিএনপির ভেতরেও এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। দলের সমর্থকদের একটি অংশ মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে সৎ, ভদ্র ও দায়িত্বশীল—এ নিয়ে তাদের বড় কোনো সংশয় নেই। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার মতো বিশাল ও জটিল দায়িত্ব তিনি কতটা দক্ষতার সঙ্গে সামলাতে পারবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি পাওয়া যায়নি।

আর এখানেই শুরু হচ্ছে তারেক রহমান সরকারের আসল পরীক্ষা।

কারণ একটি সরকারকে শুধু ভালো মানুষ দিয়ে পরিচালনা করা যায় না; প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন, সঠিক সিদ্ধান্ত, যোগ্য মন্ত্রী, শক্তিশালী আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে—সরকারের ঘোষণা ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে দূরত্ব কতটা কমানো যায়।

আরেকটি প্রশ্নও ইতোমধ্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে ঘুরছে—তারেক রহমান কি বড় কোনো ষড়যন্ত্রের কবলে পড়ছেন?

এই প্রশ্নের পক্ষে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ প্রকাশ্যে নেই। ফলে এটিকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে বিএনপির সমর্থকদের কেউ কেউ মনে করছেন, সরকারকে দুর্বল করতে প্রশাসনের ভেতরে-বাইরে কোনো কোনো মহল সক্রিয় থাকতে পারে। আবার অন্য একটি অংশের বক্তব্য, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ দিয়ে নিজেদের প্রশাসনিক ব্যর্থতা আড়াল করার সুযোগ নেই। শেষ পর্যন্ত জনগণ ফলাফলই দেখতে চাইবে।

বরং এই প্রশ্নটাই এখন বেশি গুরুত্বপূর্ণ—সরকার যদি ষড়যন্ত্রের মুখোমুখি হয়, তাহলে সেই ষড়যন্ত্র মোকাবিলার সক্ষমতাও তো সরকারেরই প্রমাণ করতে হবে।

কারণ জনগণ ভোট দিয়ে একটি সরকারকে দায়িত্ব দেয় সমস্যা সমাধানের জন্য। সংকটের ব্যাখ্যা শোনার জন্য নয়।

তারেক রহমান সরকারের জন্য তাই আগামী কয়েক মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের তাৎক্ষণিক চাপ সামলে শিল্প ও অর্থনীতিকে সচল রাখা, একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে দৃশ্যমান উন্নতি ঘটানো এবং মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর অভিযান পরিচালনা—এই তিন ক্ষেত্রেই সরকারকে ফল দেখাতে হবে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হচ্ছে মানুষের প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান। কারণ ক্ষমতায় আসার সময় যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, ছয় মাস পর মানুষ তার ফলাফল দেখতে চাইছে। পরিকল্পনা, আশ্বাস কিংবা দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপের পাশাপাশি মানুষ এখন জানতে চাইছে—আজকের সমস্যা আজ কীভাবে সমাধান হবে?

তারেক রহমান সরকারের সামনে তাই এখন আর শুধু সময়ের প্রশ্ন নেই; প্রশ্ন হচ্ছে সক্ষমতার প্রমাণ দেওয়ার সময় এসেছে কি না।

প্রথম ছয় মাসকে কেউ হয়তো সরকারের জন্য প্রস্তুতির সময় হিসেবে দেখবেন। কিন্তু বিরোধী রাজনীতি, জনমত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা মিলিয়ে আগামী ছয় মাসেই হয়তো পরিষ্কার হয়ে যাবে—সরকারটি কেবল বড় বড় পরিকল্পনা করতে পারে, নাকি কঠিন সংকটের মধ্যেও কার্যকরভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে।

কারণ রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু ক্ষমতায় থেকে সেই জনপ্রিয়তা ধরে রাখা আরও কঠিন। আর আইনশৃঙ্খলা, মাদক এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে তার রাজনৈতিক মূল্য যে সরকারকেই দিতে হবে—এ নিয়ে শেষ পর্যন্ত বিএনপির সমর্থকদের মধ্যেও সংশয় থাকার কথা নয়।