দেশ ছেড়ে পালায়নি, এটাই আইভীর অপরাধ?...

“আইভীকে শামীমের কটাক্ষ”

356

স্টাফ রিপোর্টার :

নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী ও শামীম ওসমানের দ্বন্দ্ব নতুন কোনো বিষয় নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের রাজনৈতিক অবস্থান, নেতৃত্বের ধরন এবং নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য টানাপোড়েন ছিল। একসময় যে আইভীকে শামীম ওসমানের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা হতো, সেই আইভীকে নিয়েই এবার শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক মন্তব্য নতুন করে রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সম্প্রতি শামীম ওসমান বলেছেন, সাবেক মেয়র আইভী দেশে ভালোই আছেন, নিজের বাড়িতে আছেন এবং কারাগার থেকে বের হয়ে সরকারকে ধন্যবাদও জানিয়েছেন। কথাগুলো সরলভাবে শুনলে মনে হতে পারে, তিনি কেবল আইভীর বর্তমান অবস্থার কথা বলছেন। কিন্তু নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বক্তব্যটি দেখলে এর মধ্যে নিছক তথ্য জানানোর চেয়ে রাজনৈতিক কটাক্ষের সুরই বেশি স্পষ্ট বলে মনে করছেন অনেকে।

কারণ, আইভীর কারামুক্তির ঘটনাটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রতীকী ঘটনা। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলায় দীর্ঘ ৩৯১ দিন কারাভোগের পর ২০২৬ সালের ৪ জুন জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগে নিজের বাড়ি ‘চুনকা কুটিরে’ ফেরেন। সেখানে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি সরকারকে ধন্যবাদ জানান এবং বলেন, তিনি চান সকলকে নিয়ে একটি মানবিক সরকার গঠিত হোক। একই সঙ্গে কারাগারে থাকা অন্যদের প্রতিও সরকার সদয় হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

শামীম ওসমানের সাম্প্রতিক মন্তব্যে এই ঘটনাটিকেই সামনে এনে আইভীকে খোঁচা দেওয়ার চেষ্টা রয়েছে কি না—এ প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক মহলে ঘুরছে। বিশেষ করে ‘দেশে ভালো আছেন’, ‘নিজের বাড়িতে আছেন’ এবং ‘সরকারকে ধন্যবাদ দিয়েছেন’—এই বিষয়গুলো আলাদা করে উল্লেখ করার মধ্যে একটি তুলনামূলক রাজনৈতিক বার্তা খুঁজে পাচ্ছেন অনেকে।

সেই বার্তার একটি সম্ভাব্য পাঠ হলো—রাজনীতিতে অবস্থান যতই কঠিন হোক, আইভী অন্তত দেশেই ছিলেন, গ্রেপ্তার হয়েছেন, কারাগারে গেছেন, দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন এবং শেষ পর্যন্ত জামিনে বেরিয়ে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন। অন্যদিকে শামীম ওসমান বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। ফলে আইভীকে নিয়ে তাঁর ‘দেশে ভালোই আছেন’ ধরনের মন্তব্যকে অনেকেই উল্টো রাজনৈতিক ব্যঙ্গ হিসেবেই দেখছেন।

এখানেই বক্তব্যটির সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি সামনে আসে। অতীতে আইভী ও শামীম ওসমানের দ্বন্দ্ব ছিল নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত অধ্যায়। একে অপরকে ঘিরে নানা সময়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, অভিযোগ ও রাজনৈতিক অবস্থান প্রকাশ পেয়েছে। এমনকি ২০২২ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকেন্দ্রিক একটি টকশোতেও দুজনের মধ্যে প্রকাশ্য উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল।

অর্থাৎ, যাকে একসময় রাজনৈতিকভাবে সহ্য করতে না পারার মতো সম্পর্কের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো, আজ সেই আইভীর দেশে থাকা এবং কারাগারে যাওয়ার ঘটনাকেই যদি শামীম ওসমান বক্তব্যের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করেন, তাহলে এর মধ্যে রাজনৈতিক সময়ের পরিবর্তনের একটি অদ্ভুত ব্যঙ্গও রয়েছে।

রাজনীতির মাঠে আইভী ও শামীম ওসমানের অবস্থানও এখন আগের মতো নেই। আইভী দীর্ঘ কারাবাসের পর জামিনে মুক্ত হয়ে নিজের বাড়িতে ফিরেছেন। অন্যদিকে শামীম ওসমান দেশের বাইরে থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন। একই সময়ে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাকে কেন্দ্র করে শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন হয়েছে।

এই বাস্তবতায় আইভীকে নিয়ে শামীম ওসমানের মন্তব্যকে কেবল ব্যক্তিগত ঠাট্টা হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো রাজনৈতিক অর্থটি ধরা পড়বে না। বরং এটি হতে পারে পুরনো রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের নতুন বাস্তবতায় পুনর্গঠিত একটি বক্তব্য—যেখানে তিনি হয়তো বোঝাতে চাইছেন, আইভী যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গেছেন, সেটি নিয়েও তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন রয়েছে।

তবে অন্য একটি ব্যাখ্যাও রয়েছে। শামীম ওসমান হয়তো সরাসরি আইভীর রাজনৈতিক অবস্থানকে আক্রমণ না করে তাঁর কারামুক্তির পর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের বিষয়টি সামনে এনে প্রশ্ন তুলতে চাইছেন—যে রাজনৈতিক দলের নেত্রী হিসেবে আইভী দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেই দলের একজন নেতা কীভাবে বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছেন? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেও তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য খোঁজা যেতে পারে।

আবার আইভীর বক্তব্যের অন্য একটি দিকও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তিনি সরকারকে ধন্যবাদ দেওয়ার পাশাপাশি কারাগারে থাকা অন্যদের মধ্যে যারা নিরপরাধ, তাদের প্রতিও মানবিক আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন। ফলে তাঁর বক্তব্যকে শুধু রাজনৈতিক কৃতজ্ঞতা হিসেবে দেখলে বক্তব্যটির মানবিক অংশটি বাদ পড়ে যায়।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে একসময় আইভীকে ঘিরে শামীম ওসমানের বিরোধিতা ছিল প্রকাশ্য। আজ সেই আইভীর ‘দেশে থাকা’ এবং ‘নিজের বাড়িতে ফিরে আসা’ যদি শামীম ওসমানের বক্তব্যের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সময়ের পরিহাসও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কারণ রাজনীতিতে কখন কে প্রতিপক্ষ, কে অভিযুক্ত, কে কারাগারে এবং কে দেশের বাইরে—এসব সমীকরণ খুব দ্রুত বদলে যায়।

তাই শামীম ওসমানের বক্তব্যের আসল রাজনৈতিক অর্থ হয়তো আইভীকে নিয়ে তাঁর নতুন কোনো অবস্থান নয়; বরং পুরনো প্রতিপক্ষকে নতুন বাস্তবতার আয়নায় দাঁড় করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। আইভীকে তিনি প্রশংসা করছেন না, আবার সরাসরি আক্রমণও করছেন না—বরং তাঁর দেশে থাকা, কারাগারে যাওয়া এবং মুক্তির পর সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশকে সামনে এনে এক ধরনের রাজনৈতিক কটাক্ষ ছুড়ে দিচ্ছেন।

আর এখানেই নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসে—যে দুই রাজনীতিক একসময় একই দলের ভেতর থেকেও একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, তাদের একজন আজ দেশে ফিরে নিজের বাড়িতে, অন্যজন দেশের বাইরে থেকে রাজনীতি নিয়ে কথা বলছেন। ফলে শামীম ওসমানের ‘আইভী ভালোই আছেন’ মন্তব্যটি শেষ পর্যন্ত আইভীকে যতটা না নিয়ে, ততটাই যেন তাঁর নিজের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থানকেও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

রাজনীতির ভাষায় এটিই হয়তো সবচেয়ে বড় টিটকারি—যাকে একসময় প্রতিপক্ষ ভেবে আক্রমণ করা হয়েছে, সময়ের পরিবর্তনে তাকেই উদাহরণ হিসেবে টেনে নিজের বক্তব্য প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছে। আর সেই বক্তব্যের ভেতর দিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবেই প্রশ্ন উঠছে—নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত কে কোথায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর কে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন?