সুদের টাকার জন্য বিক্রি করে দেয়া সেই নবজাতক উদ্ধার

174
সুদের টাকার জন্য বিক্রি করে দেয়া সেই নবজাতক উদ্ধার নারায়ণগঞ্জ ফার্স্ট নিউজ: সুদের টাকা আদায়ের জন্য একজন নির্মাণশ্রমিকের নবজাতককে বিক্রি করে দিয়েছিলেন ঋণ দেয়া লাকী বেগম নামের এক নারী। এক বছর আগে বিক্রি করে দেয়া শিশুটিকে উদ্ধার করেছে ফতুল্লা পুলিশ। শিশুটিকে বিক্রি ও কিনে নেয়ার অভিযোগে তিনজনের নামে মামলা করেছে পুলিশ। লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জের পিডাব্লিডি কলোনী এলাকায়। ইটভাটা শ্রমিক রানী আক্তারের এমন অভিযোগের পরে বিষয়টি নিয়ে নড়চেড়ে বসে প্রশাসন।

নারায়ণগঞ্জ ফার্স্ট নিউজ: সুদের টাকা আদায়ের জন্য একজন নির্মাণশ্রমিকের নবজাতককে বিক্রি করে দিয়েছিলেন ঋণ দেয়া লাকী বেগম নামের এক নারী। এক বছর আগে বিক্রি করে দেয়া শিশুটিকে উদ্ধার করেছে ফতুল্লা পুলিশ। শিশুটিকে বিক্রি ও কিনে নেয়ার অভিযোগে তিনজনের নামে মামলা করেছে পুলিশ।

লোমহর্ষক এই ঘটনাটি ঘটেছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার আলীগঞ্জের পিডাব্লিডি কলোনী এলাকায়। ইটভাটা শ্রমিক রানী আক্তারের এমন অভিযোগের পরে বিষয়টি নিয়ে নড়চেড়ে বসে প্রশাসন।

শনিবার (১৬ এপ্রিল) রাতে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর এলাকার দক্ষিণপাশা এলাকা থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়। শিশুটিকে কিনে নেয়ার অভিযোগে রানু (৪০) নামের এক নারীকেও আটক করা হয়েছে।

রানু বেগম গণমাধ্যম কর্মীদের জানায়, তার একটি ছেলে ও একটি মেয়ে। কিন্তু ছেলেটি প্রতিবন্ধি। তাই সে একটি দত্তক নেয়ার জন্য আত্মীয়-স্বজনদের বলে রেখেছিলো। প্রায় একবছর আগে ঢাকার শ্যামপুরে আফসার করিম রোডের মৃত আয়াত আলীর স্ত্রী সুমা তাকে ফোনে জানায় একটি নবজাতক বিক্রি করা হবে। পরে তিনি ৬০ হাজার টাকায় ওই শিশুটিকে কিনে নেন।

এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাজমুল হাসান বলেন, শিশু বিক্রির অভিযোগের ভিত্তিতে তিনজনের নামে মামলা হয়েছে। শিশুটিকে কেনার অপরাধে রানু ও বিক্রির অভিযোগে লাকী ও তার স্বামীকে মামলায় আসামী করা হয়েছে।

রানী আক্তার ভাগ্যবদলের আশায় বছর চারেক আগে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার বাদুরতলা থেকে স্বামীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ এসেছিলেন তিনি। ইট ভাঙার শ্রমিকের কাজ শুরু করেন। তারপর থেকে কলোনির সুদের মহাজন আজাদের বাড়িতেই ভাড়া থাকেন তারা। আজাদের ছোট মেয়ে লাকি বেগমের কাছ থেকেই ঋণ নিয়েছিলেন রানীর স্বামী হান্নান।

৫ হাজার টাকার ঋণের জন্য প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা সুদ গুনতে হবে। ঋণ শোধ না হলে চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়বে সেই টাকা। অর্থাৎ মাসিক ৮০ শতাংশ হারে ঋণ নেওয়ার পর সময়মতো টাকা পরিশোধ করা না গেলে সেই সুদসহ পুরো টাকার জন্য প্রতি মাসে ফের ৮০ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। এমন শর্তে দুই বছর আগে লাকি বেগম নামের এক নারীর কাছে থেকে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন রানী আক্তারের স্বামী নির্মাণশ্রমিক হান্নান চৌকিদার।

রানী আক্তারের অভিযোগ, দুই বছর আগে লাকির কাছ থেকে স্বামীর নেওয়া মাত্র পাঁচ হাজার টাকা ঋণের সুদ হিসাবে এ পর্যন্ত ২ লাখ ১০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। তারপরও আরও ১ লাখ ৩ হাজার টাকা পাওনা বলে দাবি করছেন লাকি। টাকা শোধ করতে না পারায় ১ বছর আগে জন্ম নেওয়া তাঁর একদিন বয়সী নবজাতককে ২৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। ঋণ শোধ না হলে মারধরের ভয়ে রানীকে রেখে নারায়ণগঞ্জ ছেড়ে পালিয়েছেন তাঁর স্বামী।

সুদের জালে আটকা পড়ে নিজের সন্তানকে হারানোর কথা বলতে গিয়ে কাঁদেন রানী। তিনি বলেন, দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে তাঁকে সর্বস্বান্ত করে দেওয়া হয়েছে। রানী বলেন, ‘গর্ভে সন্তান আসার পর ওরে পেটে নিয়াই কাজ করছি। সেই সন্তান যখন জন্ম নিল তখন আমারে না জানাইয়া একদিন বয়সী ছেলেরে বেইচা দিসে। কোথায় কার কাছে বিক্রি করসে আমি তা জানি না। আমি যখন ছেলে বেচার কারণ জানতে চাইলাম তখন লাকি বলল সুদের টেকা না দেওয়ায় ছেলেটারে বেইচা দিসে। তা ছাড়া বাচ্চা থাকলে আমার কাজ করতে সমস্যা। আর ঠিকঠাক কাজ না করা গেলে সুদের বাকি টাকা ফেরত দিতে সমস্যা হইব।’

রানীর অভিযোগ, তিনি পড়াশোনা জানেন না। শহরে পরিচিত কেউ নেই। এই সুযোগেই লাকি বেগম ও তার স্বামী হজরত আলী ঋণ বাবদ তাঁর কাছ থেকে কাগজে সই রেখেছে। সেই কাগজ দেখিয়ে থানায় মামলা করা যাবে, পালিয়ে গেলেও পুলিশ দিয়ে ধরে আনা হবে এমন ভয় দেখানো হয়েছে তাকে। ফলে সন্তান বিক্রির বিষয়ে জানাতে তিনি পুলিশের কাছে যাননি। উল্টো ইট ভেঙে যে আয় হয়েছে তা দিয়ে ঋণ শোধের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দিনের পর দিন ঋণ কেবল বেড়েছে। টাকা শোধ করতে না পেরে আয়ার কাজ করেছেন লাকি বেগমের বাড়িতে।

অভিযোগের বিষয়ে লাকি আক্তারের বাবা আজাদ বলেন, তারা কোনো সুদের কারবার করেন না। এগুলো তাঁদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। তবে তাঁর মেয়ে লাকি বেগম দিনমজুর রানী বেগমকে সুদে টাকা দিয়েছেন বলে স্বীকার করেন তিনি। তিনি জানান, বাচ্চা বিক্রি করে সুদের টাকা আদায়ের বিষয়টি তাঁর জানা নেই।

সরকারি এই দুই প্রতিষ্ঠানে তাঁরা কীসের কাজ করেন জানতে চাইলে আজাদ বলেন, তিনি সোহরাওয়ার্দী স্মৃতি মিলনায়তনের পাহারাদার আর মেয়ের জামাই হজরত আলী প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন।
এসব ঘটনায় সম্প্রতি ফতুল্লা থানায় বেশ কিছু অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগের পর থেকেই লাকি বেগম ও তাঁর স্বামী হজরত আলী পলাতক।