বক্তাবলীর জমি বেঁচাকেনা বন্ধ, এমপির হস্তক্ষেপ কামনা

245

রফিকুল ইসলাম জীবন :
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়ন জেলার অন্যতম কৃষিপ্রধান এই দুই জনপদ থেকে উৎপাদিত হচ্ছে বিপুল পরিমান আলু, ডাঁটা, উস্তা, ঝিঙা, পটল, পুই শাক, পাট শাক, বাঙ্গি, তরমুজ, ঢেঁড়সসহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি। এখনো এ দুটি ইউনিয়নের প্রায় ৯০ শতাংশ জমি কৃষি কাজে ব্যবহৃত হয়। অথচ স্থানীয়দের অভিযোগ, কৃষি এলাকার বাস্তবতা উপেক্ষা করে এমন উচ্চ সরকারি রেজিস্ট্রি মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কার্যত জমি বেচাকেনার পথ বন্ধ করে দিয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, বর্তমানে এসব এলাকায় প্রতি শতাংশ কৃষি জমি ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকায় ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে। প্রতি বিঘার (৩০ শতাংশ) মূল্য পনেরো লাখ টাকা থেকে বিশ লাখ টাকা। কিন্তু রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করেছে, তার ভিত্তিতে ফি ও করের পরিমাণ এত বেশি হয়ে দাঁড়িয়েছে যে সাধারণ কৃষক, ক্ষুদ্র জমির মালিক কিংবা মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের পক্ষে জমি নিবন্ধন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ফলে এক সময় যেখানে নিয়মিত জমি কেনাবেচা হতো, সেখানে এখন অনেক দলিলই আর রেজিস্ট্রির টেবিলে পৌঁছাচ্ছে না। স্থানীয়দের দাবি, বাস্তব বাজারমূল্যের সঙ্গে সরকারি মূল্যায়নের বিশাল ব্যবধানের কারণে পুরো জমির বাজারে এক ধরনের স্থবিরতা নেমে এসেছে।
কৃষি জমির জন্য এমন মূল্য কেন?
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন যে এলাকায় অধিকাংশ জমি এখনো কৃষি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে কোন বাস্তবতা বিবেচনায় এত উচ্চ মূল্য নির্ধারণ করা হলো?
ভূমি সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির মতে, অনেক সময় সম্ভাব্য উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা ভবিষ্যৎ নগরায়ণের ধারণা থেকে জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু আলীরটেক ও বক্তাবলীর ক্ষেত্রে সেই মূল্যায়ন স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কৃষকদের ভাষ্য, জমির প্রকৃত বাজারদর যদি এক রকম হয় আর রেজিস্ট্রির হিসাব যদি আরেক রকম হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষ। কারণ জমি বিক্রি করে কেউ চিকিৎসা করান, কেউ সন্তানের পড়াশোনার খরচ চালান, কেউ আবার ব্যবসার পুঁজি সংগ্রহ করেন। কিন্তু রেজিস্ট্রি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে সেই সুযোগও সীমিত হয়ে যায়।
জমি বেচাকেনা কমলে ক্ষতি কার?
বিশ্লেষকরা বলছেন, জমির বাজার স্থবির হয়ে গেলে শুধু ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো অর্থনীতি।
প্রথমত, জমি ক্রয়-বিক্রয় কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আদায় কমে যায়। দ্বিতীয়ত, জমির মালিকরা সম্পদ নগদায়ন করতে পারেন না। তৃতীয়ত, বিনিয়োগ ও আবাসন খাতেও এর প্রভাব পড়ে। চতুর্থত, অনেকে রেজিস্ট্রির উচ্চ ব্যয় এড়াতে অনানুষ্ঠানিক চুক্তির দিকে ঝুঁকতে পারেন, যা ভবিষ্যতে আইনি জটিলতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয়দের মতে, সরকারের উদ্দেশ্য রাজস্ব বৃদ্ধি হলেও বাস্তবে অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণের কারণে উল্টো নিবন্ধনের সংখ্যা কমে যাচ্ছে বা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে কাংখিত রাজস্বও আদায় হচ্ছে না।
কৃষিপ্রধান অঞ্চলের প্রতি অবিচার?
আলীরটেক ও বক্তাবলীর বাসিন্দাদের একটি বড় অংশের অভিযোগ, কৃষিপ্রধান এই দুই ইউনিয়নের সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রে শহরকেন্দ্রিক বা বাণিজ্যিক এলাকার মূল্য কাঠামোর সাদৃশ্য দেখা যাচ্ছে। অথচ বাস্তবে এখানকার অর্থনীতি এখনো কৃষিনির্ভর।
তাদের প্রশ্ন, যেখানে কৃষকরা ফসল উৎপাদন করে জেলার খাদ্য ও সবজির চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, সেখানে কৃষি জমির ওপর এমন আর্থিক চাপ কেন সৃষ্টি করা হবে?
স্থানীয়রা মনে করেন, কৃষকদের উৎসাহিত করার পরিবর্তে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের জন্য নতুন সংকট তৈরি করেছে।
রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু :
আলীরটেক ও বক্তাবলী ইউনিয়নের এই সংকট এখন ধীরে ধীরে রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়েও পরিণত হচ্ছে। কারণ বিষয়টি সরাসরি হাজারো কৃষক, ভূমির মালিক ও সাধারণ পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কিত।
স্থানীয়দের দাবি, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের কথা বলা হলেও বাস্তবে কৃষিপ্রধান এলাকার মানুষ এখন রেজিস্ট্রি মূল্য নিয়ে চরম ভোগান্তির মধ্যে রয়েছেন।
এ কারণে তারা স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল আমিনের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের প্রত্যাশা, তিনি বিষয়টি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করবেন এবং ভূমি মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আলীরটেক ও বক্তাবলীর জমির মূল্য পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নেবেন।
এলাকাবাসীর দাবি :
স্থানীয়দের মতে, বাস্তব বাজারমূল্য, জমির প্রকৃতি, কৃষি উৎপাদন এবং এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় এনে নতুন করে মূল্য নির্ধারণ করা প্রয়োজন। তারা বলছেন, কৃষি জমির ওপর অযৌক্তিক রেজিস্ট্রি ব্যয় চাপিয়ে দিয়ে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তাদের ভাষায়, আমরা কর দিতে আপত্তি করি না। কিন্তু সেই কর ও রেজিস্ট্রি ব্যয় বাস্তবসম্মত হতে হবে। কৃষকের জমির ওপর শহরের মূল্য চাপিয়ে দিলে জমির বাজার যেমন বন্ধ হয়ে যায়, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষও।
এখন দেখার বিষয়, কৃষিপ্রধান এই দুই ইউনিয়নের মানুষের দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও দাবির প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কতটা গুরুত্ব দেয় এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য তাদের প্রত্যাশা পূরণে কী ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ##