নিজস্ব প্রতিবেদক :
ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ভারতের আদালতই নেবে বলে জানিয়েছে দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর প্রশ্নটি এখন শুধু রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; ভারতের বিদ্যমান আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়াও এতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর এক প্রতিবেদনে ভারতের সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে প্রত্যর্পণের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত রাজনৈতিকভাবে নেওয়া হবে না। ভারতের আদালতের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। মূলত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয় কি না, প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় সেগুলো পড়ে কি না এবং অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় পরীক্ষা করা হবে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাঠানো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ অনুরোধটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রচলিত আইন ও নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরীক্ষা করছে। গত জুলাইয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, এ বিষয়ে ভারতের অবস্থানে পরিবর্তন হয়নি এবং প্রত্যর্পণের বিষয়টি আইনগতভাবেই বিবেচনা করা হবে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্রও ভারতকে দেওয়া হয়েছে বলে ভারতীয় কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
চুক্তিতে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত বা দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের সুযোগ রাখা হলেও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যসম্পন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, হামলা, আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারসহ কিছু গুরুতর অপরাধকে রাজনৈতিক অপরাধ হিসেবে গণ্য না করার কথাও চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আদালতে দেওয়া রায় এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভারতের আইনি কাঠামোতে কীভাবে বিবেচিত হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতে চলে যান। এরপর থেকেই তিনি সেখানে অবস্থান করছেন। ২০২৫ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়। শেখ হাসিনা ওই রায় প্রত্যাখ্যান করে এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
এদিকে চলতি বছরের জুলাইয়ে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ঘোষণা দেন, তিনি এবং আওয়ামী লীগের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা ডিসেম্বরের দিকে বাংলাদেশে ফিরে এসে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে চান। তিনি এমনকি গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করেন।
তবে শেখ হাসিনার এই ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কারণ একদিকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন, অন্যদিকে বাংলাদেশে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও বর্তমানে নিষিদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ভারতও এখন পর্যন্ত তাকে স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কথা জানায়নি। বরং নয়াদিল্লির বক্তব্য হলো, বিষয়টি আইন ও নির্ধারিত বিচারিক প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা করা হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জেও শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক ও সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করছেন, ঘোষিত সময়ের মধ্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরা সহজ হবে না। তাদের যুক্তি, মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং ভারতের আইনি প্রক্রিয়া—দুই দিক থেকেই বিষয়টি এখন জটিল অবস্থায় রয়েছে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক আলোচনায় একই সঙ্গে উঠে আসছে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম শামীম ওসমানের নাম। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় শামীম ওসমানসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে। মামলাটি নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, সাইনবোর্ডসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০ জন নিহত হওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে।
জুন থেকে ওই মামলায় সাক্ষ্যগ্রহণও শুরু হয়েছে এবং আসামিরা পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই বিচার চলছে। জুলাইয়ের শেষ দিকে মামলায় একজন প্রসিকিউশন সাক্ষী শামীম ওসমানের ছেলে অয়ন ওসমানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেন।
নারায়ণগঞ্জের অনেকের ধারণা, শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমান—দুজনের ক্ষেত্রেই দেশে ফেরার প্রশ্নটি এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, বরং বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। ফলে তারা যে সময়সীমার কথা বলে দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন, সেই সময়ের মধ্যে তারা আদৌ দেশে ফিরবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং ভারতের প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। অন্যদিকে শামীম ওসমানের মামলাও ইতোমধ্যে বিচারপর্যায়ে পৌঁছে যাওয়ায় তার দেশে ফেরার ক্ষেত্রেও গ্রেপ্তার ও বিচার মোকাবিলার বিষয়টি সামনে রয়েছে। মামলার অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাজা হতে পারে—এমন আশঙ্কাও করছেন নারায়ণগঞ্জের অনেকে। তবে আদালতের চূড়ান্ত রায় না হওয়া পর্যন্ত তার সম্ভাব্য সাজা সম্পর্কে নিশ্চিত মন্তব্য করার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের ফেরার ঘোষণা এখন বাংলাদেশের রাজনীতির পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে ভারতের বর্তমান অবস্থান এবং প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া বিবেচনায় নিলে ডিসেম্বরেই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা নিশ্চিত—এমন কোনো সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
একইভাবে শামীম ওসমানের ক্ষেত্রেও দেশে ফেরার প্রশ্নটি তার বিরুদ্ধে চলমান বিচারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। ফলে আগামী কয়েক মাসে আদালতের কার্যক্রম, ভারতের সিদ্ধান্ত এবং দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ—এই তিনটি বিষয়ই শেখ হাসিনা ও শামীম ওসমানের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শেখ হাসিনার দেশে ফেরা না ফেরার বিষয়টি যদি সত্যিই ইন্ডিয়ান আদালত স্বিদ্ধান্ত নেয় তাহলে তার দেশে ফিরা অনিশ্চিৎ হয়ে পরতে পারে বলেই মনে করেন নারায়ণগঞ্জের অধিকাংশ মানুষ। আর শেখ হাসিনা না ফিরলে যে শামীম ওসমানও ফিরবেন না এটা নিশ্চিৎ। শুধু তাই নয় শেখ হাসিনা ফিরলেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় না ফিরা পর্যন্ত শামীম ওসমান ফিরবেন না এটা নিশ্চিৎ করেই বলা যায়।




