জিয়া আর তারেক জিয়ার সরকারের যে পার্থক্য

চরম অর্থনৈতিক ও খাদ্যসংকটে জিয়া বলেছিলেন “নো প্রব্লেম” আর এখন?

61

নিজস্ব প্রতিবেদক :

একটি দেশের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় কোনটি—যখন অর্থ নেই, নাকি যখন মানুষের মনে আশাও থাকে না? ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি জনগণের মনোবল ভেঙে পড়া একটি রাষ্ট্রের জন্য আরও বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। আর এখানেই রাষ্ট্রনায়কের নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।

বাংলাদেশের ইতিহাসে জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় আসার সময় দেশ ছিল চরম অর্থনৈতিক ও খাদ্যসংকটে বিপর্যস্ত। সেই সময় খাদ্য ছিল সবচেয়ে বড় জাতীয় সমস্যা। কিন্তু সংকটের কথা বলে জনগণকে আরও হতাশ না করে তিনি মানুষের শক্তির ওপর আস্থা রাখার বার্তা দিয়েছিলেন। সাড়ে সাত কোটি মানুষের চৌদ্দ কোটি হাতকে কাজে লাগানোর কথা বলে তিনি বোঝাতে চেয়েছিলেন—সম্পদ শুধু রাষ্ট্রের কোষাগারে থাকে না, মানুষের কর্মক্ষমতাও একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।

তার সেই বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল গভীর। তিনি মূলত মানুষকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, দেশ দরিদ্র হতে পারে, কিন্তু দেশের মানুষ অসহায় নয়। সংকট আছে, কিন্তু সেই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার শক্তিও আছে।

আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। দেশ দুর্ভিক্ষের মধ্যে নেই, অর্থনীতির আকারও অতীতের তুলনায় অনেক বড়। কিন্তু নতুন ধরনের সংকট সামনে এসেছে। বিশেষ করে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় বড় চাপ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন কমে যাওয়ার খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্যও জনমনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও সৌরবিদ্যুতের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছেন। কিন্তু একই সময়ে সংকট মোকাবিলায় লোডশেডিং ব্যবস্থাপনা এবং সময়ের অপেক্ষার কথাও সামনে এসেছে।

অর্থাৎ সরকার সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করছে—এমন বার্তা যেমন আছে, তেমনি সংকট দ্রুত কাটছে না—এই বাস্তবতাও স্পষ্ট।

আর এখানেই প্রশ্ন উঠছে, জনগণের সামনে সরকারের যোগাযোগের ভাষা কেমন হওয়া উচিত?

একজন মন্ত্রী যখন বলেন, সংকট কাটাতে সময় লাগবে, তখন সেটি হয়তো বাস্তবতার স্বীকারোক্তি। কিন্তু জনগণ যদি বারবার শুধু শোনে—সংকট আছে, সমস্যা আছে, সময় লাগবে, এখনই সমাধান সম্ভব নয়—তাহলে মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে এক থেকে দুই বছর সময় লাগতে পারে—এমন বক্তব্যও এসেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের কথাও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকে মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও বলা হয়েছে এবং শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা তৈরির উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছে। অর্থাৎ সরকার শুধু অর্থনীতি বা জ্বালানি নয়, আইনশৃঙ্খলা ও মাদক নিয়েও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

কিন্তু জনগণ শেষ পর্যন্ত কী শুনতে চায়?

তারা অবশ্যই বাস্তবতা জানতে চায়। তারা জানতে চায় সংকট কেন হয়েছে, কতদিন থাকবে এবং সমাধানের পরিকল্পনা কী। কিন্তু এর পাশাপাশি তারা এটাও শুনতে চায়—‘আমরা পারব।’

এই জায়গাতেই জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বর্তমান সময়ের নেতৃত্বের তুলনা টানা হচ্ছে। জিয়ার সময়ের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। তখনকার অর্থনীতি, জনসংখ্যা, রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। তাই দুই সময়কে সরাসরি এক পাল্লায় মাপাও ঠিক হবে না। কিন্তু সংকটের সময় জনগণের মনোবল ধরে রাখার নেতৃত্বের দর্শন থেকে তুলনা করা যেতেই পারে।

জিয়ার বক্তব্যের মূল শক্তি ছিল মানুষের ওপর আস্থা। তিনি সংকটকে অস্বীকার করেননি; বরং সংকট মোকাবিলায় মানুষের শ্রম ও সক্ষমতাকে সামনে এনেছিলেন।

বর্তমান সরকারের জন্যও হয়তো এখানেই একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই, অর্থনৈতিক চাপ আছে, মাদক আছে, আইনশৃঙ্খলার সমস্যা আছে—এসব বাস্তবতা জনগণকে জানাতেই হবে। কিন্তু একই সঙ্গে জনগণকে বলতে হবে, সরকার কীভাবে এসব সংকট থেকে বেরিয়ে আসবে।

কারণ একটি সরকার শুধু সমস্যার হিসাব দেবে না, সমাধানের রোডম্যাপও দেবে। শুধু কতদিন লাগবে তা বলবে না, সেই সময়ের মধ্যে কী কী করা হবে সেটিও জানাবে।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষের আস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সম্পদ। সেই আস্থা হারিয়ে গেলে অর্থনৈতিক সংকট আরও কঠিন হয়ে ওঠে। আর মানুষের মধ্যে যদি এই বিশ্বাস তৈরি করা যায় যে ‘সমস্যা আছে, কিন্তু সরকার সমাধানের পথে এগোচ্ছে’, তাহলে কঠিন সময়ও অপেক্ষাকৃত সহজে পার করা সম্ভব।

তাই প্রশ্নটি শেষ পর্যন্ত জিয়া বনাম তারেক জিয়া নয়; প্রশ্নটি নেতৃত্বের দর্শন নিয়ে।

সংকটের সময় একজন নেতা কি জনগণকে শুধু সংকটের ভয় দেখাবেন, নাকি সংকটের মধ্যেও আশার পথ দেখাবেন—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কারণ মানুষ সবসময় সরকারের কাছে অলৌকিক সমাধান চায় না। মানুষ চায় সত্য কথা, স্পষ্ট পরিকল্পনা এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস।

আর সেই জায়গায় বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হয়তো অর্থের চেয়েও বেশি—জনগণের মনে নতুন করে আশার সঞ্চার করা।