ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল লাইনে বাড়ছে ব্যয়, বাড়ছে দুর্ভোগ...

এক যুগেও শেষ হয়নি রেলওয়ের তিন বছরের প্রকল্প

36

নিজস্ব প্রতিবেদক :

তিন বছরে শেষ হওয়ার কথা ছিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প। অথচ এক যুগ পেরিয়ে গেলেও শেষ হয়নি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের কাজ। চার দফা মেয়াদ বাড়ানোর পরও ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৫৭ দশমিক ২০ শতাংশ। এরই মধ্যে প্রকল্পের ব্যয়ও প্রায় ২৮০ কোটি টাকা বেড়েছে। এখন আবার ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

ফলে তিন বছরের একটি প্রকল্প শেষ করতে সময় লাগতে পারে প্রায় ১৪ বছর। এতে একদিকে যেমন নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুটের লাখ লাখ যাত্রী কাঙ্ক্ষিত রেলসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ায় জনগণের অর্থের ওপর বাড়ছে চাপ।

২০১৪ সালে ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে দ্রুত ও সহজ রেল যোগাযোগ নিশ্চিত করতে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। তিন বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।

কিন্তু নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে বেড়েছে ব্যয়ও। বর্তমানে প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা, চাষাঢ়া-নারায়ণগঞ্জ অংশে জায়গা সংকট এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিসহ বিভিন্ন কারণে প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়েছে। একপর্যায়ে আগের চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজ অসমাপ্ত রেখেই প্রকল্প থেকে সরে যায়। এতে প্রায় দুই বছর প্রকল্পের কাজ কার্যত বন্ধ ছিল।

দীর্ঘ অচলাবস্থা কাটাতে ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল ‘জিপিটি-স্ট্যান্ডার্ড জয়েন্ট ভেঞ্চার’-এর সঙ্গে ৩১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার নতুন চুক্তি করে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে অবশিষ্ট ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণের পাশাপাশি বিদ্যমান মিটারগেজ লাইনকে ডুয়েলগেজে রূপান্তরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তবে নতুন ঠিকাদার দায়িত্ব নেওয়ার পরও প্রকল্পের কাজ প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

প্রকল্পটির দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগা এবং বারবার মেয়াদ ও ব্যয় বৃদ্ধি গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকল্প অনুমোদনের আগে জমি, জায়গা ও বাস্তবায়নযোগ্যতা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণে শুধু নির্মাণ ব্যয়ই বাড়ছে না, এর সঙ্গে বাড়ছে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগও। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ ট্রেনে যাতায়াত করেন। ডাবল লাইন ও ডুয়েলগেজ ব্যবস্থা চালু হলে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো, যাতায়াতের সময় কমানো এবং যাত্রীসেবা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হতো।

কিন্তু প্রকল্পটি সময়মতো শেষ না হওয়ায় সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন যাত্রীরা। পাশাপাশি সড়কপথের যানজট ও বাড়তি ভাড়ার কারণে তাদের ভোগান্তিও বাড়ছে।

অন্যদিকে প্রকল্পের ব্যয় ৩৭৮ কোটি ৬৬ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ৬৫৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা হওয়ায় বাড়তি প্রায় ২৮০ কোটি টাকার আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। এই অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণ এবং সময় বৃদ্ধির পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রকল্পটির শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি, ব্যয় বৃদ্ধি, ঠিকাদার নিয়োগ ও পরিবর্তন, কাজ বন্ধ থাকার সময় এবং প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা বা দায়িত্বে অবহেলা থাকলে তা চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কারণ উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ মূলত জনগণের অর্থ। দীর্ঘসূত্রতা ও অব্যবস্থাপনার কারণে একটি প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেলে তার বোঝাও শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে। তাই ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ডাবল লাইন প্রকল্পে আর শুধু মেয়াদ বাড়ানোর পরিবর্তে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা, ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে। ##