বিশেষ প্রতিনিধি :
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনকে আধুনিক, পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বড় ধরনের উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ১ হাজার ৬০ কোটি ৯৯ লাখ ৭৫ হাজার ১১২ টাকার রেকর্ড বাজেট ঘোষণার পর এবার এর বাইরে নারায়ণগঞ্জ নগরীর উন্নয়নে আরও প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।
গত ৩০ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণা করেন প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। এটি নাসিক প্রতিষ্ঠার পর সর্বোচ্চ বাজেট। বাজেটে রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, নিরাপদ পানি সরবরাহ, খাল পুনরুদ্ধার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সবুজায়নসহ নাগরিক সেবার বিভিন্ন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
তবে প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খানের দাবি, নাসিকের নিজস্ব বাজেটের পাশাপাশি সরকার নারায়ণগঞ্জ নগরীর দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য আরও বড় অঙ্কের বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার এই বিশেষ বরাদ্দের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ শহরের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করে একটি আধুনিক নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
এই বিশেষ বরাদ্দের আওতায় নগরীর গুরুত্বপূর্ণ হাটবাজারগুলো নতুন করে নির্মাণ, বাস ও ট্রাক স্টেশন স্থানান্তর, প্রয়োজনীয় জমি বরাদ্দ নিয়ে নতুন স্থাপনা নির্মাণ এবং নগরীর যানজট ও অপরিকল্পিত স্থাপনা ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ শহরের বর্তমান বাস ও ট্রাক স্টেশনগুলোর অবস্থান, যানবাহনের চাপ এবং নগরীর অভ্যন্তরে পণ্যবাহী যান চলাচলের কারণে সৃষ্ট জনদুর্ভোগ কমাতে নতুন করে পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ বা বরাদ্দের মাধ্যমে এসব স্থাপনা শহরের বাইরে বা পরিকল্পিত স্থানে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
এর পাশাপাশি নগরীর হাটবাজার ব্যবস্থাপনাকেও আধুনিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। অপরিকল্পিত বাজার, ফুটপাত দখল, সড়কে পণ্য ওঠানামা এবং যানজটের মতো সমস্যাগুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন বাজার ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, নারায়ণগঞ্জকে শুধু রাস্তা-ঘাট নির্মাণ করে আধুনিক শহর বানানো সম্ভব নয়। একটি শহরের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত মাস্টার প্ল্যান। কোথায় বাজার থাকবে, কোথায় বাস ও ট্রাক টার্মিনাল হবে, কোথায় আবাসিক এলাকা, কোথায় বাণিজ্যিক এলাকা এবং কীভাবে যানজট ও জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ করা হবে—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নগরকে সাজাতে হবে।
তিনি আরও জানান, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট ১৪টি স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য আরও ৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসব ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে খেলাধুলার সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি নগরীর ক্রীড়া পরিবেশ উন্নত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
নাসিক প্রশাসকের পরিকল্পনা অনুযায়ী, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, নগরীর সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নই হবে এই বৃহৎ উন্নয়ন কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। আধুনিক সড়কব্যবস্থা, উন্নত ড্রেনেজ, জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ পানি, সবুজায়ন, ক্রীড়া অবকাঠামো এবং যানজট নিয়ন্ত্রণ—সবকিছুকে একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর আগে নাসিকের বাজেট ঘোষণার সময়ও প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান নাগরিক দুর্ভোগ কমানোকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। বাজেটে রাস্তা-ড্রেন নির্মাণ, পানি সরবরাহ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, খাল পুনরুদ্ধার, জলাবদ্ধতা নিরসন, যানজট নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে বাসসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও সাখাওয়াত হোসেন খান জানিয়েছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী নারায়ণগঞ্জকে আধুনিক নগরীতে পরিণত করার পরিকল্পনা নিয়ে তিনি কাজ করছেন।
সব মিলিয়ে নাসিকের নিজস্ব ১ হাজার ৬০ কোটি টাকার বেশি বাজেটের পাশাপাশি প্রস্তাবিত বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ বাস্তবায়ন করা গেলে নারায়ণগঞ্জের নগর ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে বাস-ট্রাক স্টেশন ও হাটবাজারের পুনর্বিন্যাস, নতুন ক্রীড়া অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি মাস্টার প্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হলে শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জ ধীরে ধীরে একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক মহানগরীর রূপ পেতে পারে।
তবে এত বড় উন্নয়ন কর্মসূচির সফলতা নির্ভর করবে সঠিক পরিকল্পনা, জমি ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার ওপর। নগরবাসীর প্রত্যাশা—বড় অঙ্কের এই অর্থ যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে দৃশ্যমান উন্নয়নে রূপ নেয় এবং নারায়ণগঞ্জ সত্যিই একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত হয়।




